চট্টগ্রাম: এলপিজি গ্যাসের অবৈধ মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রি ঠেকাতে চট্টগ্রামে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বৈঠক করে গঠন করা হয়েছে তদারকি কমিটি। আমদানি থেকে শুরু করে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সরবরাহের প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘বাজারে এলপিজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তাদের কাছে সরকার নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস পৌঁছানো নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। কোনো পর্যায়ে গ্যাস মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি কিংবা অতিরিক্ত দাম আদায়ের সুযোগ দেওয়া হবে না।’
জেলা প্রশাসক জানান, দেশে এলপিজি আমদানি ও সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র চট্টগ্রাম। দেশের ২১টি মাদার প্ল্যান্টের মধ্যে সাতটি চট্টগ্রামে এবং বাকি ১৪টি মোংলায় অবস্থিত। চট্টগ্রামের প্ল্যান্টগুলোতে কোন প্রতিষ্ঠান কী পরিমাণ এলপিজি আমদানি করছে এবং সেই গ্যাস কোথায় সরবরাহ করা হচ্ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, চট্টগ্রামে কার্যক্রম পরিচালনাকারী এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এরইমধ্যে বৈঠক করেছে জেলা প্রশাসন। বৈঠকে সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির মাধ্যমে আমদানিকারকদের কাছ থেকে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ করে আমদানির পর কী পরিমাণ গ্যাস পরিবেশকদের কাছে যাচ্ছে এবং সেখান থেকে কতটুকু খুচরা বাজারে পৌঁছাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমদানিকারক, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সরবরাহের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও দফতরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে, যাতে কোনো পর্যায়ে অসৎ উদ্দেশ্যে গ্যাস আটকে রাখা কিংবা বেশি দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি না হয়।’
এদিকে বাজারে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি ও মজুতদারির অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এলপিজির নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করেছে। নতুন মূল্য কার্যকরের পর ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করছে জেলা প্রশাসন।
ডিলারদের বিরুদ্ধে মূল্য কারসাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এলপিজির দাম বাড়ানোর আগে চট্টগ্রামের কয়েকজন খুচরা ব্যবসায়ী জেলা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, কিছু ডিলার কারসাজি করে গ্যাসের দাম বাড়াচ্ছেন। তবে নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার পর এ ধরনের আর কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।’
অভিযোগ না থাকলেও বাজার তদারকি বন্ধ করা হয়নি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা ও সরবরাহব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এলপিজির সরবরাহ পরিস্থিতির পটভূমি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কাতার ও ওমানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে এলপিজি আমদানিতে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে গ্যাসের চাহিদা অপরিবর্তিত রয়েছে।’
জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি খাতের সরবরাহ প্রায় ১ শতাংশ। বাকি চাহিদার বড়ো অংশ পূরণ করে প্রায় ১৯টি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে সরবরাহে চাপ তৈরি হলেও চট্টগ্রামের বাজারে যাতে এর সুযোগ নিয়ে কেউ কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সবাইকে নজরদারিতে রাখার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করা এবং অবৈধ মজুতদারি ও মূল্য কারসাজি প্রতিরোধে জেলা প্রশাসনের অভিযান ও তদারকি চলবে।’