বাংলাদেশে সম্প্রতি পাস করা “সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬” সম্পত্তির অধিকার, বয়স্কদের সুরক্ষা এবং ইসলামিক ফারায়েজ নীতির সঙ্গে অসঙ্গতির কারণে বিতর্ক তৈরী হয়েছে। তবে এটিকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় দ্বন্দ্বে পরিণত হতে দেওয়া উচিত নয়। এজন্য প্রয়োজন আইনের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য এবং হেবা’র প্রতিষ্ঠিত নীতির সাথে সামঞ্জস্য তৈরীতে ইসলামী আইনবিশারদদের পরামর্শ নেয়া।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনীতে একজন ব্যক্তিকে সম্পত্তি হস্তান্তর করার অনুমতি এবং একই সাথে হস্তান্তরিত সম্পত্তি আমৃত্যু ব্যবহার ও উপভোগ করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। এই আইনী সংশোধনীতে পিতা-মাতা এবং সন্তানদের, দাদা-দাদি এবং নাতি-নাতনিদের এবং স্বামী-স্ত্রীদের মধ্যে সম্পদের হস্তান্তরকে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। দাতার আগে গ্রহিতা মারা গেলে, গ্রহিতার আইনি উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হতে পারবে, তবে দাতার আমৃত্যু সেই সম্পদ ব্যবহার এবং উপভোগের সংরক্ষিত অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
আইনজীবী এবং অধিকারকর্মীরা এই ব্যবস্থাকে প্রবীন সম্পত্তি মালিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা মনে করছেন। মূলত নবজাতক থেকে বয়োবৃদ্ধ সবাইকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষে রাষ্ট্র এধরনের আইন প্রণয়নে উদ্দোগী হয়েছে।
বাংলাদেশে, বয়স্ক পিতা-মাতারা কখনও কখনও তাদের বাড়ি বা অন্যান্য সম্পদ সন্তানদের “হেবা” বা উপহারের মাধ্যমে হস্তান্তর করে থাকেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পত্তির মালিকানা বদলে যাবার পর দাতা নিজের আত্বনির্ভরতা হারিয়ে ফেলেন।
কিছু ক্ষেত্রে, দুর্বল চিত্তের বাবা-মাকে প্ররোচিত করা হয় বা চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেওয়া হয় এবং পরে অবহেলা, পরিত্যাগ বা সম্পত্তি নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি হয়। একবার মালিকানা হস্তান্তর এবং নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন হলে, নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া, সুবিধাভোগীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হেবা পাওয়ার জন্য প্রতারণা ও দ্বৈততার আশ্রয় নেয়। প্রায়শই হেবা দলিলকে সরকারের নির্ধারিত নিবন্ধন ফি ফাঁকি দেয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। এলক্ষে প্রদত্ত সম্পদকে উপহার হিসেবে দেখানো হয়। ক্ষেত্র বিশেষে পিতা-মাতা চাপের মুখে কোনো কোনো সন্তানকে বঞ্চিত করে গোপনে হেবা দলিল সম্পাদন করেন গ্রহিতাদের ষড়যনোত্রর শিকার হয়ে। এটি আজকাল একটি খুব সাধারণ ঘটনা। এতে পরিবারিক ঐক্য ও বন্ধন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মধুর সম্পর্ক আজীবন শত্রুতায় পরিণত হয়। এসব ঘটনা ইসলাম বিরোধী এবং কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং, এটি হেবার নিগূঢ় ধর্মীয় মূল্যবোধকে ক্ষুণ্ন করে।
এটি একটি প্রকৃত সামাজিক সমস্যা। এই আইনটি দাতার আজীবন সম্পত্তি ব্যবহার ও উপভোগ করার অধিকারকে বিধিবদ্ধ স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে একটি সুস্পষ্ট সমাধান দিতে পারে। তারপরও উলামা ও ইসলামী রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তি উড়িয়ে দেওয়া সঠিক হবেনা। তাদের প্রধান উদ্বেগ ”হেবা”-এর সাথে সম্পর্কিত, স্বেচ্ছায় এবং নিঃশর্ত উপহার দেওয়ার ইসলামিক ধারণা।এতে দাতার উদারতা, সদিচ্ছা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সম্প্রীতি সুরক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এটি মৌলিকভাবে একটি স্বেচ্ছাসেবী কাজ এবং এটি জবরদস্তি বা কারসাজির পণ্য হওয়া উচিত নয়।
নতুন আইনে দাতার সম্পত্তি হস্তান্তরের পরে আজীবন উপভোগ করার জন্য একটি বিধিবদ্ধ অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এটি অগত্যা হেবার ঐতিহ্যগত ধারণার সাথে অভিন্ন নয়। প্রকৃতপক্ষে, আইনমন্ত্রী মোঃ আসাদুজ্জামান স্বীকার করেছেন যে আজীবন ভোগের অধিকার নিয়ে বিতর্কের একটি বিষয় রয়েছে।তাই ইসলামিক নীতির সাথে সংশোধনী আইনটি কতোটা সাংঘর্ষিক তা অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।
সংশোধনীতে হেবা বা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তরের বিদ্যমান কাঠামোকে বাতিল করে না। বরং, এটি হস্তান্তরের পরে দাতার অব্যাহত ব্যবহার এবং সম্পত্তির উপভোগ রক্ষা করার জন্য একটি আইনি প্রক্রিয়া তৈরি করে। বিশেষ বিধানগুলো ইসলামী আইনশাস্ত্রের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা আলেম-ওলেমা এবং আইন বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে কোন বিধানগুলো প্রতিষ্ঠিত নীতিমালা লঙ্ঘন করে তা সঠিকভাবে চিহ্নিত না করে সমগ্র আইনটিকে “ইসলাম বিরোধী” বলা কতোটা সমিচীন সেটা ভেবে দেখা উচিত।
বিতর্কের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিড়ম্বনাও রয়েছে। যদি বয়স্ক পিতা-মাতাকে হেবা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয় বা তাদের সম্পত্তি হস্তান্তর করার পরে পরিত্যাগ করা হয়, এই ধরনের কর্মকান্ড হেবার চেতনাকে দুর্বল করে। একটি ইসলামিক উপহার স্বেচ্ছায় এবং সদিচ্ছা ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে নিহিত বলে মনে করা হয়। সম্পত্তির জন্য একজন বয়স্ক পিতা-মাতাকে শোষণ করা সেই মূল্যবোধের সাথে স্পষ্টতই অসঙ্গতিপূর্ণ।
এদিকে, নাগরিকদের প্রতারণা, জবরদস্তি এবং শোষণ থেকে রক্ষা করা রাষ্ট্রের একটি বৈধ দায়িত্ব রয়েছে। একজন বয়স্ক দাতার তাদের বাড়িতে থাকার এবং নির্বিঘ্নে জীবন যাপনের অধিকার রক্ষা করাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্মীয় মতবাদে হস্তক্ষেপ হিসাবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
একই সঙ্গে আইনপ্রণেতাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। সম্পত্তি হস্তান্তর, উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইন বাংলাদেশে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই ক্ষেত্রগুলিকে প্রভাবিত করে এমন কোন আইনের খসড়া তৈরি করা উচিত এবং এমনভাবে প্রয়োগ করা উচিত যাতে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় নীতিগুলির সাথে অপ্রয়োজনীয় সংঘর্ষ এড়ানো যায়।
এই কারণেই ইসলামিক পণ্ডিত এবং অন্যান্য অংশীজনের সাথে আইনটি নিয়ে আরও আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। এই ধরনের পরামর্শ নিছক প্রতীকী হওয়া উচিত নয়। তাদের নতুন বিধান এবং হেবার মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইনি সম্পর্ক পরীক্ষা করা উচিত এবং অতিরিক্ত সুরক্ষা বা সংশোধন প্রয়োজন রয়েছে কিনা তা নির্ধারণ করা উচিত।
বিরোধী দল ও ধর্মীয় দলগুলোকে এ বিষয়ে আরো গঠনমূলক আলোচনা করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব আরো বেশী। সরকারকে অবশ্যই অন্যদের উদ্বেগগুলেোশুনতে হবে। আইনবিরোধীদেরও রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তে স্পষ্ট আইনি এবং ধর্মতাত্ত্বিক যুক্তি দিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরা উচিত। যদি এই সংশোধনীতে কোন দ্বান্দ্বিক ইস্যু থাকে তাহলে সেগুলোকে চিহ্নিত করা এবং সংসদ ও উপযুক্ত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা সমাধান করা উচিত।
বাংলাদেশের জনমিতিতে বয়স্কদের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে ঐতিহ্যগত পারিবারিক কাঠামো পরিবর্তন হচ্ছে। অনেক বয়স্ক লোকের জন্য, তাদের বাড়ি এবং সম্পত্তি তাদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তার প্রধান উৎস হয়ে থাকে। একটি আইনি কাঠামো যা তাদের সন্তানদের সম্পত্তি হস্তান্তর করার পরে নিঃস্ব হওয়া থেকে রক্ষা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে।
এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা। সরকারের উচিত ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনে অযথা হস্তক্ষেপ না করে বয়স্ক এবং অরক্ষিত সম্পত্তির মালিকদের রক্ষা করা। আর ইসলামিক পণ্ডিতদের উচিত সম্পত্তি-সম্পর্কিত বৈষম্য নিরসনের উপায় বের করা। শোষণের বাস্তবতা স্বীকার করা এবং নিশ্চিত করা যাতে বৈধ ধর্মীয় উদ্বেগ দুরিভূত হয়। আইনজীবী এবং নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনগুলোর উচিত বয়স্কদের সুরক্ষা বাস্তবায়নের কার্যকর নীতি ও কৌশল নিশ্চিত করা। তবে সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পদ্ধতি যেন ধর্মীয় মূল্যবোধগুলিকে ক্ষুন্ন না করে।
হেবা দাতার উদারতা, সদিচ্ছা এবং পারিবারিক দায়িত্বের নীতির উপর নির্ভর করে। বয়স্ক দাতাদের তাদের বাড়ি এবং সম্পদের নিরাপত্তা হারানোর ঝুঁকি প্রশমনে আইন একটি পরিপূরক সামাজিক উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারবে যদি এটি প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় নিয়মগুলিকে অনুচিতভাবে পরিবর্তন না করে।
তাই নতুন আইন অন্ধভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয় বা তাড়াহুড়ো করে নিন্দা করাও উচিত নয়। এর বিধানগুলি সাবধানতার সাথে পরীক্ষা করা উচিত, এর সুরক্ষাগুলি অনুশীলনে পরীক্ষিত এবং বৈধ উদ্বেগগুলি পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত।
বাংলাদেশের এ ইস্যুতে বিভক্তির চেয়ে সংলাপ বেশী দরকার। সরকার, আইন প্রণেতা, ওলামা এবং আইন বিশেষজ্ঞরা যদি অনিশ্চয়তার ক্ষেত্রগুলি সমাধানের জন্য একত্রে কাজ করতে পারে তবে সংশোধনীটি বিতর্কের কারণ না হয়ে সুরক্ষার একটি উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
আইনের মৌল উদ্দেশ্যটি সহজ হওয়া উচিত। তা হলো- দেশের ধর্মীয় ও আইনগত ঐতিহ্যের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা করেই সম্পত্তিতে বয়স্কদের মালিকানা, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।