সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে সরকারি বেতন কাঠামো নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ এবং জনসেবার মান নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে।
নতুন জাতীয় পে-স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং প্রথম গ্রেডে সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো একবারে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারের হিসাবে এর ফলে অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা হতে পারে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন পুনর্নির্ধারণের মধ্যে নীতিগতভাবে আপত্তির কিছু নেই। দীর্ঘদিন একই বেতন কাঠামোয় থাকা কর্মীদের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও বাস্তব আয় কমে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। দক্ষ ও যোগ্য জনবলকে সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট ও ধরে রাখার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতামূলক বেতন গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু প্রশ্নটি কেবল বেতন কত বাড়ল, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো এই বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে রাষ্ট্র ও জনগণ কী পাবে?
সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা রাষ্ট্রের নিয়মিত বা অনুন্নয়ন ব্যয়ের অংশ। একবার বেতন কাঠামো বাড়লে তা ভবিষ্যতের জন্য স্থায়ী আর্থিক দায় তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি, পদোন্নতি, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার অতিরিক্ত ব্যয়। ফলে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক চাপ শুধু চলতি অর্থবছরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এই বিষয়টি বাংলাদেশের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলকভাবে কম। সরকারি নীতিপত্র অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই অনুপাত ছিল ৮ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমে ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে সরকার ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ১০ দশমিক ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়িয়ে স্থায়ী ব্যয়ের বড় বোঝা তৈরি করা হলে ভবিষ্যতে বাজেট ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও উৎপাদনশীল খাতে এখনো বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নেও দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বিলম্ব ও দুর্বলতা রয়েছে। এমন বাস্তবতায় নিয়মিত ব্যয় দ্রুত বাড়তে থাকলে উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এখানেই আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। উচ্চতর বেতন কি উন্নততর প্রশাসন নিশ্চিত করবে?
সম্প্রতি জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে দুর্নীতি, ঘুষ ও লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন। তার বক্তব্যটি সব সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে সাধারণীকরণ হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। তবে এ ধরনের মন্তব্য জনসেবা ও সরকারি প্রশাসনের জবাবদিহি নিয়ে সমাজে যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটিকে সামনে নিয়ে আসে।
উচ্চ বেতন দুর্নীতির প্রবণতা কমাতে সহায়ক হতে পারে এমন যুক্তি দীর্ঘদিনের। পর্যাপ্ত ও মর্যাদাপূর্ণ পারিশ্রমিক একটি পেশাদার ও দক্ষ আমলাতন্ত্র গড়ে তোলার অন্যতম উপাদান। কিন্তু শুধু বেতন বাড়ালেই দক্ষতা, সততা বা কর্মদক্ষতা নিশ্চিত হয় না।
একটি কার্যকর জনপ্রশাসনের জন্য প্রয়োজন মেধাভিত্তিক নিয়োগ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বিশ্বাসযোগ্য শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা কিংবা প্রমাণিত অনিয়মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। সুতরাং, নবম পে-স্কেলকে শুধু বেতন বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে না দেখে জনপ্রশাসন সংস্কারের একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
আগের বেতন কাঠামো সংশোধনের পর সরকারি সেবার মান, কর্মদক্ষতা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কতটা অগ্রগতি হয়েছে তার একটি নিরপেক্ষ মূল্যায়নও প্রয়োজন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে কেবল নতুন করে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল নাও আসতে পারে। সরকারি চাকরি যাতে শুধু আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় না হয়ে ওঠে, বরং দক্ষ ও ফলপ্রসূ জনসেবার ক্ষেত্রেও পরিণত হয় সেটিই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
এখানে আরেকটি অর্থনৈতিক দিকও বিবেচনায় নেওয়া দরকার। দেশের মোট কর্মশক্তির তুলনায় সরকারি কর্মচারীর সংখ্যা সীমিত। বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষ জাতীয় পে-স্কেল বৃদ্ধির সরাসরি সুবিধা পাবেন না। কিন্তু সরকারি ব্যয় বাড়ার অর্থনীতিতে যে প্রভাব পড়বে, তার কিছুটা তাদেরও বহন করতে হতে পারে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বড় অঙ্কের অতিরিক্ত সরকারি ব্যয় যদি সামগ্রিক চাহিদার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়তে পারে। খাদ্য, পরিবহন ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে যেসব নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার এরই মধ্যে চাপে রয়েছে, তাদের জন্য এর প্রভাব আরও কঠিন হতে পারে।
জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের চাপও বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি বড় বাস্তবতা। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের ওঠানামা আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ে প্রভাব ফেলে। তাই নতুন স্থায়ী ব্যয়ের পাশাপাশি সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
এই বিবেচনায় পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তটি গুরুত্বপূর্ণ। এতে একবারে বাজেটের ওপর বড় ধাক্কা কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু ধাপে বাস্তবায়ন মানেই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় কমে যাওয়া নয়। আগামী বছরগুলোতে বাড়তি বেতন-ভাতা ও পেনশনের অর্থ কীভাবে জোগান দেওয়া হবে, তার একটি বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা সরকারের থাকা প্রয়োজন।
সেই পরিকল্পনার সঙ্গে অবশ্যই রাজস্ব সংস্কারকে যুক্ত করতে হবে। করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নত করা, কর ফাঁকি ও অপচয় কমানো এবং করদাতাদের আনুগত্য বাড়ানো ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা কঠিন। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের প্রতিটি টাকার বিপরীতে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে, সেটিও নিয়মিত মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
নবম পে-স্কেল তাই সরকার ও সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তির ভিত্তি হতে পারে। তা হলো, উন্নত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে উন্নততর পেশাদারিত্ব, পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতা এবং অধিকতর জবাবদিহিতা। এর অংশ হিসেবে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্পষ্ট কর্মদক্ষতার সূচক নির্ধারণ করা যেতে পারে। জনসেবা কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেওয়া হচ্ছে, কতটা অভিযোগ নিষ্পত্তি হচ্ছে, নাগরিকদের সেবা পেতে কতটা সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে এসব বিষয়ও কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।
ডিজিটাল ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা গেলে ছোটখাটো দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগও কমানো সম্ভব। নিয়োগ, পদোন্নতি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের কাছে সরকারের বেতন-ভাতার মোট অঙ্ক যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ তারা কী ধরনের সেবা পাচ্ছেন। সরকারি দফতরে কাজ কত দ্রুত হচ্ছে, লাইসেন্স ও নথিপত্র পেতে অযথা হয়রানি হচ্ছে কি না, সেবা সহজলভ্য কি না এবং কর্মকর্তারা আইন ও বিধি মেনে দায়িত্ব পালন করছেন কি না এসবই নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের কার্যকারিতার প্রকৃত মাপকাঠি।
সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য পারিশ্রমিক অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত আয় কমে গেলে দক্ষ ও যোগ্য জনবল ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু একই সঙ্গে করদাতাদেরও এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, বাড়তি সরকারি ব্যয় উন্নততর প্রশাসন ও জনসেবায় রূপান্তরিত হবে। নবম পে-স্কেলকে তাই নিছক বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে পারে জনপ্রশাসনকে আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার একটি বড় সুযোগ।
উচ্চ বেতন পেশাদার জনপ্রশাসন গঠনে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিকল্প নয়। কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, জবাবদিহি ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা না গেলে বাড়তি বেতন শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্য শুধু বাড়তি স্থায়ী ব্যয়ের বোঝাই হয়ে উঠতে পারে।
নবম পে-স্কেলের প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে তখনই, যখন এর মাধ্যমে একদিকে সরকারি কর্মচারীদের ন্যায্য ও মর্যাদাপূর্ণ পারিশ্রমিক নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে নাগরিকরা পাবেন আরও দক্ষ, স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল প্রশাসন।
জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় মূল নীতিটি হওয়া উচিত খুবই সরল। বেতন বাড়বে, কিন্তু তার সঙ্গে বাড়তে হবে কর্মদক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিতাও।