ঢাকা: নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশেই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটি (এমপিসি)। মূল্যস্ফীতি কমার প্রবণতায় থাকলেও তা এখনো চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামে অস্থিরতা, দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আপাতত নীতি সুদহারে কোনো পরিবর্তন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার(২৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এমপিসির বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর ফলে গত ৩১ জুলাই নেওয়া সিদ্ধান্তই বহাল থাকল। ওই বৈঠকে প্রায় ২১ মাস পর নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল। নতুন হার ২ আগস্ট থেকে কার্যকর হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এবারের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে মূল্যস্ফীতি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেলেও তা এখনো সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। ফলে নীতি সুদহার আরও কমিয়ে বাজারে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর আগে মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য নতুন চাপগুলো পর্যবেক্ষণ করতে চায় এমপিসি।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর প্রভাব বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়তে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মুদ্রানীতি পর্যালোচনাতেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকিকে মূল্যস্ফীতির অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব। জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার দামেও চাপ তৈরি হতে পারে। ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ভাড়া বাড়ানোর খবরও এসেছে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিয়েছে এমপিসি। বেতন বাড়লে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে। তবে একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় ও বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়লে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের এক এমপিসি পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছিল, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নে রাজস্ব আয় যথেষ্ট না বাড়লে সরকারকে ঘাটতি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। এতে অর্থবাজারে চাপ তৈরি হয়ে আর্থিক ব্যবস্থায় সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
জুলাইয়ের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘ সময় পর নীতি সুদহার কমানোর পথ শুরু করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। ১০ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে অর্থনীতিতে ঋণ ও বিনিয়োগের গতি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। তবে এক দফা কমানোর পরই আবার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭ দিনের রেপো কার্যক্রমেও ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ হার দেখা যাচ্ছে। ২২ সেপ্টেম্বরের রেপো নিলামে ১৪৫টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মোট ৯ হাজার ২৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকার প্রস্তাব দেয় এবং একই পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়।
অন্যদিকে ২৩ সেপ্টেম্বরের ৯১ দিনের বাংলাদেশ কম্পাউন্ডেড রেট ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ।
একই দিনে আন্ত:ব্যাংক বাজারে রাতারাতি অর্থের গড় হার ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
অর্থাৎ নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকলেও অর্থবাজারে সুদের হার, তারল্য ও ঋণের চাহিদার ওপর এর প্রভাব থাকবে।
নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে বহাল রাখার ফলে ব্যাংকগুলোর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি অর্থ সংগ্রহের মূল ব্যয়ও আপাতত একই থাকছে। ফলে ব্যাংকঋণের সুদহারে বড় ধরনের নিম্নমুখী পরিবর্তনের সুযোগ সীমিত থাকবে।
এতে ব্যবসা ও শিল্প খাতের নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় কমার গতি ধীর হতে পারে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদের হার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে বহাল থাকবে।
এ অবস্থায় আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতি কীভাবে এগোয়, জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব কতটা ছড়ায়, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতিতে কী ধরনের চাহিদা তৈরি হয় এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কোন পথে যায়—এসব তথ্য পরবর্তী নীতি সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
পরবর্তী সিদ্ধান্তের আগে অর্থনীতির গতিপথ দেখবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক
এমপিসি জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ধাক্কা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ সামনে মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতিও নীতি নির্ধারণে গুরুত্ব পাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬ মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতিও বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে ২৩ সেপ্টেম্বরের নতুন এমপিসি রেজল্যুশন প্রকাশ করা হয়েছে।
এমপিসির বৈঠকে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ছাড়াও ডেপুটি গভর্নর মো. হাবিবুর রহমান, অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কামাল মুজেরী, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফেরদৌসী নাহার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমাম আবু সাঈদ অংশ নেন।
বৈঠকে সদস্যসচিব হিসেবে ছিলেন মুদ্রানীতি বিভাগের পরিচালক ড. মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান এমপিসি তালিকাতেও এসব সদস্যের নাম রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জুলাইয়ে নীতি সুদহার কমানোর পর সেপ্টেম্বরের বৈঠকে তা অপরিবর্তিত রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের অবস্থান নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার দিকে কতটা এগোয় এবং জ্বালানি ও পে স্কেলের মতো নতুন চাপ কতটা বাস্তব প্রভাব ফেলে, তার ওপর পরবর্তী সুদহার সিদ্ধান্ত অনেকটাই নির্ভর করবে।