ঢাবি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) দুই দিনব্যাপী ‘লোক প্রশাসন আন্তর্জাতিক সম্মেলন-২০২৬’ সমাপ্ত হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রোববার (৪ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবন মিলনায়তনে লোক প্রশাসন বিভাগের উদ্যোগে ‘Rethinking Public Administration in an Era of Global Crisis: Governance and Policy Responses’ প্রতিপাদ্যেকে সামনে রেখে এ আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সম্মেলনের আহ্বায়ক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দা লাসনা কবিরের সভাপতিত্বে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চীনের সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. জেং শিয়াংইউ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টারের (BPATC) রেক্টর সাঈদ মাহবুব খান, সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (SANPA)-এর সেক্রেটারি ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এবং লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. মুসলেহ উদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনের সমাপনী বক্তব্য প্রদান করেন কানাডার ম্যাকমাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আহমেদ শফিকুল হক।
এবারের সম্মেলনে বিশ্বের ১২টি দেশ থেকে মোট ১৮০টি গবেষণাপত্র জমা পড়ে। যাচাই-বাছাই শেষে ৭৬টি গবেষণাপত্র ১৫টি অ্যাকাডেমিক সেশনে উপস্থাপনের জন্য নির্বাচিত হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিদেশের ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকদের পাশাপাশি বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের গবেষকরা অংশ নেন। দুই দিনব্যাপী আয়োজনে উপস্থাপিত গবেষণাগুলোতে বৈশ্বিক সংকট, শাসনব্যবস্থা, নীতি প্রণয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, প্রযুক্তি ও পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে লোক প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর নিয়াজ আহমদ খান বলেন, লোক প্রশাসন এমন একটি ডিসিপ্লিন, যেটিকে উদযাপন করার মতো যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বাংলাদেশের সমসাময়িক বিভিন্ন সমস্যা, বিশেষ করে সাইবার-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে লোক প্রশাসনের গবেষকদের আরও কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এ বিভাগকে এমনভাবে এগিয়ে যেতে হবে, যাতে একদিকে দক্ষ গবেষক এবং অন্যদিকে যোগ্য সিভিল সার্ভেন্ট তৈরি হয়। রাজনৈতিক চিন্তাচেতনাকে বাইরে রেখে শুধু অ্যাকাডেমিশিয়ান ও গবেষকদের নিয়ে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের সাহস দেখানো অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
ড. জেং শিয়াংইউ কার্যকর লোক প্রশাসনের জন্য সরকারব্যবস্থার বিভিন্ন মাত্রা এবং অভিন্ন ভবিষ্যৎ নির্মাণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক চর্চার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে আরও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তোলার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সাঈদ মাহবুব খান বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি খাত ব্যবস্থাপনা ও নৈতিক নেতৃত্ব গঠনে বাংলাদেশ পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ট্রেনিং সেন্টারের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণে আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দক্ষ, দায়িত্বশীল ও নৈতিকতাসম্পন্ন জনবল গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
ড. মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দিকে আলোকপাত করলে লোক প্রশাসনের ক্ষেত্রে দেশভেদে নানা ধরনের অভিজ্ঞতা ও চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। চীন গত কয়েক দশকে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। এর পেছনে দেশটির নিজস্ব লোক প্রশাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা এবং সেই গবেষণার ফল বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজতে আরও বেশি আলোচনা ও গবেষণা প্রয়োজন।
সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আহমেদ শফিকুল হক বলেন, লোক প্রশাসন বিষয়ে গবেষকরা বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি সেগুলোর সম্ভাব্য সমাধানও তুলে ধরেছেন। এখন এসব গবেষণা ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময়। তবে শুধু আর্থিক সম্পদ থাকলেই হবে না; কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন দক্ষ ও পর্যাপ্ত জনবল। সরকারি ব্যবস্থার টেকসই পুনরুদ্ধারের জন্য জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে লোক প্রশাসন বিভাগের চেয়ারপারসন প্রফেসর ড. সৈয়দা লাসনা কবির বলেন, বর্তমান বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু দক্ষ হলেই চলবে না, একইসঙ্গে পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতাও থাকতে হবে। তাদের উদ্ভাবনী হতে হবে, আবার দায়িত্বশীলও হতে হবে। সংকট মোকাবিলা করার পাশাপাশি সংকট থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পরিবর্তন ও উন্নত করতে হবে।
তিনি বলেন, লোক প্রশাসনকে নতুন করে ভাবতে হলে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এমন প্রতিষ্ঠান ও জ্ঞানের ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে, যা শিখতে, খাপ খাওয়াতে, উদ্ভাবন করতে এবং জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে সক্ষম। এসময় তিনি সম্মেলনে উপস্থাপিত নির্বাচিত গবেষণাপত্র নিয়ে একটি বই প্রকাশের কথা জানান।