ঝড় সবার জীবনেই আসে, কিন্তু সেই ঝড়কে টেক্কা দিয়ে কীভাবে আবার সাফল্যের চূড়া ছুঁতে হয়, তার একটি বড় উদাহরণ শাকিরা। একসময় ব্যক্তিগত জীবনের কেলেঙ্কারি, কর ফাঁকির আইনি জটিলতা আর ১২ বছরের সম্পর্কের আকস্মিক ভাঙন যাকে প্রায় শেষ করে দিয়েছিল, ৪৯ বছর বয়সে এসে সেই শাকিরাই এখন দাঁড়িয়ে আছেন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সোনালী শিখরে। কলম্বিয়ান এই পপ ডিভা তাঁর জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়কে পেছনে ফেলে ২০২৬ সালের বিশ্বমঞ্চে যেভাবে নিজের রাজত্ব পুনরোদ্ধার করেছেন, তা একবিংশ শতাব্দীর পপ সংস্কৃতির ইতিহাসে অন্যতম সেরা ‘কামব্যাক’ বা প্রত্যাবর্তনের গল্প। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, লাতিন আমেরিকার এই সুর-সাম্রাজ্ঞী কেবল গান গেয়েই মন জয় করেন না, বরং জীবনের প্রতিটি পিচে কীভাবে ছক্কা মারতে হয় তাও তার জানা আছে।
২০২২ সালে স্প্যানিশ ফুটবল তারকা জেরার্ড পিকের সাথে দীর্ঘ ১২ বছরের সম্পর্কের আকস্মিক ও বেদনাদায়ক অবসান শাকিরাকে এক গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু বিষণ্ণতার চাদরে নিজেকে লুকিয়ে ফেলার পাত্রী শাকিরা নন। তিনি তার ভেতরের সমস্ত ক্ষোভ, কষ্ট আর প্রতারণার জবাব দিলেন তার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র দিয়ে, তা হলো সঙ্গীত। ২০২৩ সালের শুরুতে মুক্তি পাওয়া তার ‘Shakira: Bzrp Music Sessions, Vol. 53’ গানটি ছিল পিকের বিরুদ্ধে এক শৈল্পিক প্রতিশোধ, যা বিশ্বব্যাপী চার্টগুলোতে ঝড় তোলে। শাকিরা নিজেই রসিকতা করে বলেছিলেন, গান লেখাটা তার জন্য থেরাপিস্টের কাছে যাওয়ার চেয়েও সস্তা এবং কার্যকরী ছিল। তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র থেকেই জন্ম নেয় অ্যালবাম ‘লাস মুহেরেস ইয়া নো ইয়োরান’ (নারীরা আর কাঁদে না), যা বিশ্বজুড়ে ৪২১.৬ মিলিয়ন ডলার আয় করে একজন স্প্যানিশ শিল্পীর সর্বকালের সর্বোচ্চ আয়কারী সফরের রেকর্ড গড়ে।
শাকিরার জীবনের আরেকটি বড় কাঁটা ছিল স্পেনের আদালতের কর ফাঁকির মামলা, যা আট বছর ধরে তার মানসিক শান্তি এবং স্বাস্থ্য কেড়ে নিয়েছিল। গণমাধ্যমের নিষ্ঠুর আক্রমণ আর কুৎসা রটানোর বিরুদ্ধে একা লড়াই করে অবশেষে ২০২৬ সালের ১৮ই মে তিনি পান পরম মুক্তি। স্পেনের জাতীয় আদালত শাকিরাকে ২০১১ সালের কর ফাঁকির অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণ খালাস দেয় এবং স্পেন সরকারকে নির্দেশ দেয় গায়িকাকে ৬০ মিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য। এই ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে শাকিরা অকপটে জানান, দীর্ঘদিনের বিনিদ্র রাত আর সামাজিক কলঙ্কের অবসান ঘটিয়ে আদালত অবশেষে তার সততার মর্যাদা দিয়েছে। আইনি এবং মানসিক এই মুক্তি শাকিরার আত্মবিশ্বাসকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যা তার চলমান বিশ্ব সফরে এক নতুন জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।
‘ফিফা বিশ্বকাপ আর শাকিরা’এই দুটি নাম যেন একে অপরের পরিপূরক। ২০১০ সালের সেই কালজয়ী ‘ওয়াকা ওয়াকা’র পর ২০২৬ বিশ্বকাপে শাকিরা ফিরছেন এক সম্পূর্ণ নতুন এবং মহিমান্বিত রূপে। নাইজেরিয়ান তারকা বার্না বয়ের সাথে তার গাওয়া ‘দাই দাই’ (এগিয়ে চলো) গানটি এবারের বিশ্বকাপের অফিসিয়াল থিম সং হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় চমক অপেক্ষা করছে ১৯শে জুলাই নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে, যেখানে বিশ্বকাপ ফাইনালের হাফটাইম শোতে ম্যাডোনা এবং বিটিএস-এর সাথে মঞ্চ মাতাবেন তিনি। এই টুর্নামেন্ট থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির শতভাগ শাকিরা দান করছেন সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য। শিশুদের উদ্দেশে তার বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট, প্রত্যেক চ্যাম্পিয়নই একসময় প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া শিশু ছিল, তাই স্বপ্ন দেখা কখনোই বন্ধ করা যাবে না।