Wednesday 10 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘ওভার দ্য রেইনবো’র জাদুকরী অভিনেত্রী ডোরোথির জন্মদিন আজ

এন্টারটেইনমেন্ট ডেস্ক
১০ জুন ২০২৬ ১৭:০৬

রূপালি পর্দার সেই রূপালি জুতো পরা, ফ্রক গায়ে দেওয়া, দুই বিনুনির মিষ্টি মেয়ে ডোরোথিকে মনে আছে? ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’ চলচ্চিত্রের সেই ডোরোথি, যে ঝড়ের কবলে পড়ে হারিয়ে গিয়েছিল এক জাদুনগরে। পর্দায় সেই চরিত্রে অভিনয় করে যিনি বিশ্বজুড়ে অমর হয়ে আছেন, তিনি আর কেউ নন, হলিউডের সোনালী যুগের অন্যতম সেরা নক্ষত্র জুডি গারল্যান্ড।

আজ ১০ জুন, এই কালজয়ী মার্কিন অভিনেত্রী ও গায়িকার ১০৪তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৯ সালে যখন সিনেমাটি মুক্তি পায়, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। তবে পর্দার এই জাদুকরী সাফল্যের আড়ালে জুডির নিজের জীবনটাও ছিল কোনো টানটান সিনেমার চেয়ে কম নয়। কোনো কাল্পনিক গল্প বা রঙ চড়ানো তথ্য ছাড়াই, হলিউডের নথিপত্র এবং ঐতিহাসিক সত্যের ওপর ভিত্তি করে সাজানো হয়েছে তার জীবনের এই বিশেষ ফিচার।

বিজ্ঞাপন

১৯২২ সালের ১০ জুন আমেরিকার মিনেসোটাতে যখন এই কালজয়ী অভিনেত্রীর জন্ম হয়, তখন তার নাম রাখা হয়েছিল ফ্রান্সেস এথেল গাম। বাবা-মা দুজনেই থিয়েটারের সাথে যুক্ত থাকায় একদম ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার ছিল সহজাত টান। মাত্র দুই বছর বয়সে বড় দুই বোনের সাথে মঞ্চে গান গেয়ে নজর কেড়েছিলেন তিনি। পরবর্তীতে হলিউডের বিখ্যাত স্টুডিও ‘এমজিএম’ (MGM)-এর কান খাড়া হয় এই কিশোরীর কণ্ঠ শুনে। স্টুডিওর কর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই মেয়ের গলায় ম্যাজিক আছে।

তবে হলিউডে পা রাখার পর তার নাম বদলে রাখা হয় জুডি গারল্যান্ড। এমজিএম স্টুডিওর কঠোর চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে জুডির দিন-রাত কেটে যেত গান আর অভিনয়ের কঠোর পরিশ্রমে। তৎকালীন হলিউডের নিয়ম ছিল অত্যন্ত কঠিন; তারকা তৈরি করার জন্য স্টুডিওগুলো কিশোর-কিশোরীদের ওপর অমানুষিক খাটুনি চাপিয়ে দিত। কিন্তু জুডির প্রতিভা ছিল এতই প্রখর যে, শত চাপের মুখেও তার কণ্ঠের জাদু আর অনবদ্য অভিনয় তাকে খুব দ্রুতই হলিউডের শীর্ষ তারকাদের সারিতে নিয়ে আসে।

‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’ এবং ডোরোথির সেই অবিস্মরণীয় জুতো

১৯৩৯ সালটি জুডি গারল্যান্ডের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এল ফ্রাঙ্ক বাউমের বিখ্যাত রূপকথা অবলম্বনে তৈরি হয় ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’। সিনেমাটিতে কানসাসের এক সাধারণ মেয়ে ডোরোথির চরিত্রে জুডিকে কাস্ট করা হয়। তবে সিনেমাটির শুটিং মোটেও সহজ ছিল না। সেই সময়ে টেকনিকালার প্রযুক্তিতে তৈরি এই সিনেমার সেটের তাপমাত্রা থাকত অত্যন্ত বেশি, তার ওপর জুডিকে তার আসল বয়সের চেয়ে ছোট দেখানোর জন্য জোর করে কষ্টদায়ক পোশাক পরিয়ে রাখা হতো।

কিন্তু ক্যামেরা যখনই অন হতো, জুডি তার সমস্ত কষ্ট ভুলে হয়ে উঠতেন নিখুঁত ডোরোথি। সিনেমায় তার গাওয়া ‘ওভার দ্য রেইনবো’ (Over the Rainbow) গানটি আজ পর্যন্ত পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং জনপ্রিয় গান হিসেবে বিবেচিত হয়। ডোরোথির পায়ে থাকা সেই বিখ্যাত ‘রুবি স্লিপার্স’ বা লাল টকটকে জাদুকরী জুতো জোড়া আজও পপ কালচারের এক বড় প্রতীক। এই একটি সিনেমাই জুডিকে রাতারাতি বৈশ্বিক তারকায় পরিণত করে এবং মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি লাভ করেন বিশেষ ‘অ্যাকাডেমি জুভেনাইল অ্যাওয়ার্ড’।

পর্দার আলোর পেছনের এক বাস্তব জীবন

পর্দায় যাকে সবসময় হাসিখুশি, প্রাণবন্ত আর জাদুকরী দেখাত, বাস্তব জীবনে জুডি গারল্যান্ডের অবয়ব ছিল ভীষণ ট্র্যাজিক। হলিউডের তীব্র প্রতিযোগিতা এবং স্টুডিওর কঠোর নিয়ন্ত্রণ তার শৈশব ও কৈশোরকে একরকম কেড়ে নিয়েছিল। স্টুডিওর কর্তারা তার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য তাকে কঠোর ডায়েটে রাখতেন এবং দীর্ঘ সময় কাজ করানোর জন্য বিভিন্ন রকমের ওষুধ বা পিল খেতে বাধ্য করতেন।

এই পিল বা ওষুধের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা জুডির পরবর্তী জীবনকে বিষাদময় করে তোলে। তিনি মানসিক অবসাদ এবং নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি পাঁচবার বিয়ে করেছিলেন, যার মধ্যে বিখ্যাত পরিচালক ভিনসেন্ট মিনেলির সাথে তার সংসার ছিল অন্যতম, এবং তাদের কন্যা লিজা মিনেলিও পরবর্তীতে হলিউডের অস্কারজয়ী অভিনেত্রী হন। পর্দার ডোরোথি যেমন সবসময় কানসাসে নিজের ঘরে ফেরার জন্য ব্যাকুল থাকতেন, বাস্তব জীবনের জুডিও যেন আজীবন এক টুকরো মানসিক শান্তি আর সুস্থ জীবনের খোঁজ করে গেছেন।

শত বছর পরও ফুরিয়ে না যাওয়া জুডি-ক্রেজে

শুধু ‘দ্য উইজার্ড অব ওজ’ নয়, জুডি গারল্যান্ড তার ক্যারিয়ারে উপহার দিয়েছেন ‘মিট মি ইন সেন্ট লুইস’ (১৯৪৪) কিংবা ‘আ স্টার ইজ বর্ন’ (১৯৫৪)-এর মতো দুর্দান্ত সব চলচ্চিত্র। ‘আ স্টার ইজ বর্ন’ সিনেমার জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে অস্কারের মনোনয়নও পেয়েছিলেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তার কনসার্টগুলো হতো কানায় কানায় পূর্ণ। ১৯৬১ সালে নিউ ইয়র্কের কার্নেগি হলে তার লাইভ কনসার্টের অ্যালবামটি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের ইতিহাসে ‘অ্যালবাম অব দ্য ইয়ার’ জয়ী প্রথম নারী অ্যালবাম হিসেবে রেকর্ড গড়ে।

১৯৬৯ সালে মাত্র ৪৭ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে তার মৃত্যুর এত বছর পরও হলিউডে জুডি গারল্যান্ডের জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি। ২০১৯ সালে তাকে নিয়ে নির্মিত ‘জুডি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে রেনি জেলওয়েগার অস্কার জিতে নেন, যা প্রমাণ করে জুডি আজও কতটা প্রাসঙ্গিক। ১০ জুনের এই দিনে বিশ্বজুড়ে চলচ্চিত্রপ্রেমীরা যখনই ডোরোথির সেই লাল জুতো কিংবা ‘ওভার দ্য রেইনবো’র সুর শোনেন, তখনই শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় ভেসে ওঠেন হলিউডের এই অমর রাজকন্যা।