আপনি কি ভেবেছেন কখনও, এমন কোনো দেশ আছে যেখানে আন্তর্জাতিক বা আঞ্চলিক বিমানগুলো ল্যান্ড করতে পারে না? হ্যাঁ, পৃথিবীর মানচিত্রে এমন দেশও আছে। আমরা সাধারণত বিমানবন্দর মানেই উড়ন্ত জেটের ল্যান্ডিং, পাইলটের সুনিপুণ ম্যানুভার আর যাত্রীদের উত্তেজনা মনে করি। কিন্তু কিছু বিশেষ কারণে কিছু দেশ বা অঞ্চলে বিমান অবতরণ করা প্রায় অসম্ভব।
উড়ন্ত শহর, কিন্তু বিমান নেই
সাধারণভাবে একটি দেশের বিমানবন্দর মানেই সেখানকার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মূল দিক। কিন্তু এমন কিছু দেশ আছে যেখানে রাজনৈতিক, ভূ-রাজনৈতিক বা ভূ-প্রাকৃতিক কারণে বিমান অবতরণ হয় না। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি বিশ্বের নানান কোণ থেকে গল্প শোনার চেষ্টা করি, তাহলে আফ্রিকার কিছু দেশ বা সমুদ্রের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোর নাম উঠে আসে।
একটি বিশেষ উদাহরণ হলো মোনাকো, যেখানে নিজস্ব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। ভ্রমণকারীরা সাধারণত নিস বা কান থেকে হেলিকপ্টার বা ছোট প্লেনে ভ্রমণ করে। ভাবুন তো, পুরো দেশ, যা মাত্র ২.০৫ বর্গ কিলোমিটার! সেখানে বড় জেট অবতরণ করতে পারবে না।
কারণগুলো: ভূ-রাজনৈতিক ও প্রাকৃতিক
১. ভূগোলের সীমাবদ্ধতা
অনেক দেশে প্রাকৃতিক ভূ-প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমন পাহাড়ী অঞ্চল, ঘন জঙ্গল বা সমুদ্রসীমার সঙ্গে ঘেরা ছোট দ্বীপ।
উদাহরণ: ভ্যাটিকান সিটি, যা পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র। এখানে কোনো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। তাই যদি কেউ প্লেনে ভ্রমণ করতে চায়, নিকটতম রোমের বিমানবন্দর ব্যবহার করতে হয়।
২. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ
কিছু দেশে আন্তর্জাতিক সংযোগ সীমিত বা বন্ধ।
উদাহরণ: উত্তর কোরিয়া। এই দেশ আন্তর্জাতিক বিমানের জন্য অনেকটা বন্ধ। বিশেষ অনুমোদন ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক বিমান অবতরণ করতে পারে না। ভাবুন, পুরো দেশে সীমিত বিমান চলাচল, এবং পাইলটদের জন্য এটি এক চ্যালেঞ্জের মতো।
৩. অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা
কিছু ছোট বা কমোন্নত দেশ বিমানবন্দর নির্মাণে ব্যয়বহুল হওয়ায় বা রক্ষণাবেক্ষণ চালানো সম্ভব না হওয়ায় বড় বিমানের অবতরণ সীমিত।
সবচেয়ে ছোট ‘নো-ল্যান্ড’ বিমানবন্দর
বিশ্বের সবচেয়ে ছোট বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে কয়েকটি এমন জায়গায় অবস্থিত, যেখানে বড় বিমানের অবতরণ প্রায় অসম্ভব।
ম্যাকাও এর ছোট বিমানবন্দর – এখানে শুধুমাত্র ছোট বিমান ও হেলিকপ্টারের অবতরণ হয়।
সান মারিনো – এ দেশে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। ভ্রমণকারীরা ইতালির নিকটতম বিমানবন্দর ব্যবহার করে হেলিকপ্টার বা গাড়িতে পৌঁছান।
এগুলোতে প্লেন অবতরণে বিশেষ দক্ষতা প্রয়োজন। পাইলটদের জন্য এটি এক ধরণের ‘এক্সট্রিম স্পোর্টস’— উড়ান, অবতরণ, আবার উড়ান!
কোথাও কোথাও ‘ল্যান্ডিং’ কল্পনাতেও কঠিন
যদি আপনি ভ্রমণপ্রেমী হন, তবে এই তথ্যটি আপনার মন মাতিয়ে দেবে:
মালদ্বীপের ছোট দ্বীপগুলো– এখানে বড় বিমান আসতে পারে না। শুধু ছোট সার্ভিস প্লেন বা হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারে। তাই রিসোর্টের অতিথিদের জন্য ‘ফ্লাইট+বোট’ কম্বিনেশন প্রচলিত।
পিটকের দ্বীপ – প্রশান্ত মহাসাগরের এই দ্বীপে বড় জেট আসার কোনো অবকাশ নেই। শুধু ছোট বিমান। মনে করুন, কোনো ছোট বিমান ছুটতে আসছে, আর আপনার চোখের সামনেই সমুদ্রের ঢেউ আর পাহাড়—এমন ‘নো-ল্যান্ড’ অভিজ্ঞতা। এগুলোতে ল্যান্ডিং মানে কেবল ‘প্লেনের চাকা মাটির সাথে স্পর্শ’ নয়, বরং এক্সট্রিম অ্যাডভেঞ্চার।
প্লেন না ল্যান্ড করলে কিভাবে ভ্রমণ হয়?
যেসব দেশে প্লেন অবতরণ করতে পারে না, সেখানে যাত্রীরা সাধারণত এইভাবে পৌঁছায়:
নিকটতম দেশের বিমানবন্দর ব্যবহার – উদাহরণ: ভ্যাটিকান বা সান মারিনো।
হেলিকপ্টার বা ছোট বিমান – আফ্রিকার নির্দিষ্ট দ্বীপ, মালদ্বীপের রিসোর্ট।
নৌপথ বা রেলপথ – কনজারভেটিভ কিন্তু কার্যকর।
এতে মজার পরিস্থিতি তৈরি হয়। আপনি হয়তো ঢাকায় বসে প্লেন ধরেছেন, কিন্তু সেখান থেকে পৌঁছাতে হবে ছোট জেট বা বোটে। মনে হবে, এ যেন ‘ভ্রমণের মিশন ইম্পসিবল’।
ইতিহাসও মুখ ফিরিয়েছে
কিছু দেশে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তার কারণে বিমানবন্দর তৈরি হয়নি।
উদাহরণ: লিবিয়া বা সিরিয়ার কিছু অঞ্চল – সন্ত্রাস ও যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিত।
উত্তর কোরিয়া – বিদেশি বিমান সাধারণত Pyongyang-এর সীমিত বিমানবন্দরে অবতরণ করে, বাণিজ্যিক যাত্রীবাহি বিমান না।
কখনও কখনও, ইতিহাসের ধাক্কা এই দেশগুলোকে ‘নো-ল্যান্ড’ অঞ্চলে পরিণত করেছে। ফলে পাইলটদের দক্ষতা এবং স্থানীয় প্রশাসনের কৌশল অপরিহার্য।
শেষকথা
আপনি যদি এমন দেশে ভ্রমণ করেন, যেখানে প্লেন নামতে পারে না, মনে রাখবেন—আপনি একধরনের বিশেষ ভ্রমণকারীর অংশ। এ ধরনের অভিজ্ঞতা কেবল চোখে নয়, হৃদয়েও স্মৃতি রাখে।