Wednesday 04 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আঙুলের স্পর্শে আলো…

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৩

মেয়েটি চুপচাপ বসে ছিল। চোখ দুটো সামনে তাকানো, কিন্তু সেই তাকানোর ভেতর কোনো দৃশ্য নেই— শুধু শূন্যতা। তবু তার আঙুল দুটো ছিল অদ্ভুত রকম ব্যস্ত। ছোট ছোট উঁচু দাগের ওপর দিয়ে নিঃশব্দে ছুটে চলেছে। মনে হচ্ছিল, সে যেন চোখ দিয়ে নয়— আঙুল দিয়েই পড়ছে পৃথিবী। আমি পাশে বসে নোটবুক খুললাম। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মেয়েটি হালকা হাসল।

— আপনি কী পড়ছেন?
— সে বলল, ‘ব্রেইলে লেখা জীবন।’

তার নাম নাজমা। বয়স পঁচিশ। জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। অথচ তার কণ্ঠে কোনো হাহাকার নেই— আছে একরাশ দৃঢ়তা।

অন্ধকারের শুরু

নাজমা বলতে শুরু করল তার গল্প। ছোটবেলায় সে বুঝতেই পারেনি যে অন্যদের চোখে যে আলো, তার চোখে তা নেই। বুঝেছে তখনই, যখন অন্য শিশুরা বই খুলে পড়তে শিখছে আর সে কেবল শব্দ শুনে মুখস্থ করছে।

বিজ্ঞাপন

‘আমি শিক্ষিত হতে চাইতাম,’ সে বলল,
‘কিন্তু সবাই বলত—অন্ধ মেয়ে, পড়াশোনা দিয়ে কী হবে?’

তার জীবনে প্রথম বড় মোড় আসে আট বছর বয়সে। একটি বিশেষ বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায় সে। সেখানেই প্রথম পরিচয় ব্রেইল লিপির সঙ্গে।

আঙুলে লেখা অক্ষর

নাজমা হাসতে হাসতে বলল, ‘প্রথম দিন ব্রেইল ছুঁয়ে ভয় পেয়েছিলাম। এত ছোট ছোট দাগ! ভাবতাম—এগুলো দিয়ে কীভাবে বই পড়ব?’

কিন্তু সেই দাগই ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে তার চোখ। আঙুলের স্পর্শে সে চিনতে শেখে অক্ষর, শব্দ, বাক্য। অন্যরা যেভাবে চোখে দেখে, নাজমা সেভাবেই আঙুলে দেখে।
‘ব্রেইল আমাকে অন্ধকার থেকে টেনে বের করেছে,’

সে বলল, ‘এটা শুধু লেখা নয়—এটা আমার স্বাধীনতা।’

পড়াশোনা আর স্বপ্ন

আজ নাজমা স্নাতক শেষ করেছে। বাংলা সাহিত্য তার প্রিয় বিষয়। কবিতা পড়ে, গল্প লেখে— সবই ব্রেইলে। মোবাইলে আছে স্ক্রিন রিডার, কিন্তু বই পড়তে তার সবচেয়ে ভালো লাগে ব্রেইল বই।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, সবচেয়ে বড় স্বপ্ন কী?
সে এক মুহূর্ত থেমে বলল, ‘আমি শিক্ষক হতে চাই। আমার মতো যারা অন্ধ, তাদের বলতে চাই—তোমরা পারো।’

তার কণ্ঠে তখন আবেগ জমে উঠছিল…
‘সমাজ আমাদের করুণা দেয়,’
‘কিন্তু আমাদের দরকার সুযোগ।’

ব্রেইল— একটি অধিকার

নাজমা জানে, ব্রেইল সবার কাছে সহজলভ্য নয়। বই কম, খরচ বেশি, সচেতনতা কম। তবু সে বিশ্বাস করে— ব্রেইল থাকলে দৃষ্টিহীন মানুষ কখনোই অশিক্ষিত থাকে না।
‘ব্রেইল আমার অধিকার,’ সে বলল, ‘এটা না থাকলে আমি আজ কিছুই হতাম না।’

সাক্ষাৎকারের শেষে

আমার কলম আর নোটবুক বন্ধ করলাম। নাজমার আঙুল তখন আবার ব্রেইলের ওপর। মনে হলো— এই আঙুলগুলো শুধু অক্ষর নয়, ভবিষ্যৎ গড়ছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। নাজমা বলল, ‘আমার গল্প লিখবেন তো?’
আমি বললাম, ‘গল্প লেখা শেষ। কিন্তু গল্প নয়। আপনি তো বাস্তবতা। আপনার গল্প অনেকের চোখ খুলে দেবে।’

বাইরে বেরিয়ে নিজের ব্যাগ পিঠে নিয়ে রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম— এই শহরের অলিগলিতে, কত নাজমা আছে, যারা আঙুল দিয়ে আলো খোঁজে। নাজমার গল্পটি হয়তো প্রকাশ পাবে। কিন্তু নাজমাকি পড়তে পারবে? কারন এই গল্পটি ত ব্রেইল প্রক্রিয়ায় যাবেনা।

আমি আবার হাঁটতে শুরু করলাম। আরেকটি গল্পের খোঁজে। আরেকটি অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকা আলোর সন্ধানে।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

দোলের আবিরে রাঙা
৩ মার্চ ২০২৬ ২৩:৪১

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর