Saturday 28 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বলিভিয়ার ডেথ রোড: বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাস্তা

ফারহানা নীলা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৩ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪৪

বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার বুক চিরে সর্পিল গতিতে বয়ে চলা এক রাস্তার নাম শুনলে আজও বুক কাঁপে অভিজ্ঞ চালকদের। নর্থ ইয়াংগাস রোড, যা বিশ্বজুড়ে ‘ডেথ রোড’ বা ‘মৃত্যুর রাস্তা’ হিসেবে কুখ্যাত। লা পাজ থেকে করোইকোর এই পথটি কেবল একটি সংযোগ সড়ক নয়, বরং এটি সাহস আর ভাগ্যের এক চরম পরীক্ষা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,৬৫০ মিটার উচ্চতায় শুরু হওয়া এই পথটি যখন নিচের দিকে নামতে থাকে, তখন মেঘের ভেতর দিয়ে এক রোমাঞ্চকর অথচ হাড়হিম করা যাত্রার সূচনা হয়।

যুদ্ধের ক্ষত থেকে উন্মাদনার পথ

এই রাস্তার ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে রক্ত আর শ্রম। ১৯৩০-এর দশকে প্যারাগুয়ের সাথে চলা চাকো যুদ্ধের সময় যুদ্ধবন্দীদের দিয়ে এই দুর্গম পথটি তৈরি করানো হয়েছিল। আমাজন অববাহিকার সাথে যোগাযোগের জন্য তখন এটিই ছিল একমাত্র উপায়। সেই সংকীর্ণ ধূলিময় পথটি নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ছিল এক মরণফাঁদ। বিশেষ করে ১৯৮৩ সালের সেই অভিশপ্ত দিনটি বলিভিয়ার ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে আছে, যখন একটি বাস প্রায় ১০০ যাত্রী নিয়ে খাদে পড়ে যায়। সেই থেকে ১৯৯০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে তিনশ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিত এই গিরিপথটি।

বিজ্ঞাপন

বামহাতি ড্রাইভিংয়ের অদ্ভুত নিয়ম

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে রাস্তার ডান বা বাম পাশ দিয়ে চলার ধরাবাঁধা নিয়ম থাকলেও, এই ডেথ রোডে প্রচলিত ছিল এক অনন্য ও আবশ্যিক নিয়ম। এখানে পাহাড়ের দিক থেকে আসা গাড়িকে নয়, বরং খাদের ধারের গাড়িকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। চালকরা বাম পাশে স্টিয়ারিং রেখে রাস্তার একেবারে কিনারা দিয়ে গাড়ি চালাতেন যাতে চাকাটি খাদের কত কাছে আছে তা সরাসরি দেখা যায়। কুয়াশা আর বৃষ্টির দিনে যখন দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসত, তখন এই বামহাতি চালনার কৌশলই ছিল জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের সরু সুতো।

মেঘের রাজ্যে প্রাণের ঝুঁকি

রাস্তাটি ভৌগোলিকভাবে এতটাই বৈচিত্র্যময় যে, যাত্রার শুরুতে আপনি যখন আল্টিপ্লানোর হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা পাবেন, কয়েক ঘণ্টা পরই নিজেকে খুঁজে পাবেন আর্দ্র ক্রান্তীয় বনাঞ্চলে। এই আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তনই রাস্তাটিকে পিচ্ছিল আর বিপজ্জনক করে তোলে। মাত্র ১০ থেকে ১১ ফুট চওড়া এই পথে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী বা গার্ডরেল নেই। একপাশে প্রায় ৬০০ মিটার গভীর খাড়া খাদ, আর অন্যপাশে পাহাড় থেকে অনবরত পড়তে থাকা ঝরনার পানি ও আলগা পাথর। এই প্রতিকূলতার কারণেই ২০০৬ সালে একটি আধুনিক বাইপাস সড়ক তৈরি করা হয়, যা সাধারণ যানবাহনের জন্য স্বস্তি নিয়ে আসে।

মৃত্যুভয় জয় করা পর্যটন

বর্তমানে বড় ট্রাক বা বাসের ভিড় না থাকলেও ডেথ রোডের আকর্ষণ কমেনি, বরং বেড়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। এটি এখন বিশ্বের অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় সাইক্লিস্টদের প্রধান গন্তব্য। প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক কেবল মাউন্টেন বাইকিংয়ের নেশায় এখানে ছুটে আসেন। তবে রোমাঞ্চের আড়ালে বিপদ কিন্তু এখনো ওত পেতে থাকে। নতুন বাইপাস হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২০ জন সাইক্লিস্ট নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তবুও প্রতি বাঁকে মৃত্যুর হাতছানি আর পাহাড়ের অবারিত সৌন্দর্য এই রাস্তাকে করে তুলেছে পৃথিবীর অন্যতম রহস্যময় এক গন্তব্য।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর