ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম জাকাতের পাশাপাশি রমজান মাসে ‘সদকায়ে ফিতর’ আদায় করা সামর্থ্যবান প্রতিটি মুসলমানের ওপর ওয়াজিব। মূলত সিয়াম সাধনার ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিমার্জন এবং ঈদের আনন্দ গরিব-দুঃখীদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিধান। ফিতরা আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক নিয়ম ও পরিমাণ জানা থাকা জরুরি।
নিচে ফিতরা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ৭টি মাসয়ালা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো…
১. ফিতরা কার ওপর ওয়াজিব?
যাহার নিকট ঈদের দিন সুবহে সাদিকে (ভোরবেলা) সাড়ে সাত তোলা সোনা বা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ বা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ থাকবে, তার ওপর ফিতরা ওয়াজিব। জাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর মালিকানায় থাকা শর্ত হলেও, ফিতরার ক্ষেত্রে বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়; ঈদের দিন ভোরে মালিক হলেও ফিতরা দিতে হবে।
২. ৫টি পণ্য দিয়ে ফিতরা আদায়ের নিয়ম
হাদিস অনুযায়ী ৫টি দ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। পণ্যভেদে এর পরিমাণ ও ওজন ভিন্ন হয়:
* গম বা আটা: সর্বনিম্ন ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম (বা এর বাজারমূল্য)।
* যব: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (বা এর বাজারমূল্য)।
* কিশমিশ: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (বা এর বাজারমূল্য)।
* খেজুর: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (বা এর বাজারমূল্য)।
* পনির: ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম (বা এর বাজারমূল্য)।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতি বছর সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ হার ঘোষণা করে। তবে সামর্থ্যবানদের জন্য কেবল গমের মূল্যে সর্বনিম্ন ফিতরা না দিয়ে উন্নতমানের পণ্য (যেমন: আজওয়া খেজুর বা পনির) অনুযায়ী ফিতরা দেওয়া অধিক সওয়াবের কাজ।
৩. শিশু ও মৃত ব্যক্তির ফিতরা
প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলমানকে নিজের এবং তার ওপর নির্ভরশীল নাবালগ সন্তানদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে।
নবজাতক: ঈদের দিন সুবহে সাদিকের আগে কোনো শিশু জন্মগ্রহণ করলে তার পক্ষ থেকে ফিতরা দিতে হবে। তবে সুবহে সাদিকের পর জন্ম নিলে ওয়াজিব নয়।
মৃত ব্যক্তি: সুবহে সাদিকের আগে কেউ মারা গেলে তার ফিতরা দিতে হয় না। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীদের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে।
৪. আদায়ের সঠিক সময়
সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয় ঈদের দিন সুবহে সাদিক হওয়ার পর। তবে রমজানের ভেতর যেকোনো সময় এটি আদায় করা যায়।
* উত্তম সময়: ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে আদায় করা।
* বিলম্বে আদায়: কেউ ঈদের নামাজের আগে দিতে না পারলে পরেও আদায় করতে পারবেন, তবে তা মাকরুহ বা অনুত্তম।
৫. ফিতরা পাওয়ার যোগ্য কারা?
জাকাত পাওয়ার যোগ্য যারা, ফিতরা পাওয়ার যোগ্যও তারা। অর্থাৎ এমন গরিব মুসলমান যার নিকট নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই। আপন ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশী যদি অভাবী হয়, তবে তাদের ফিতরা দেওয়া বেশি উত্তম। তবে নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি বা সন্তানদের ফিতরা দেওয়া জায়েজ নয়।
৬. মালিকানা নিশ্চিত করা জরুরি
ফিতরার অর্থ বা খাদ্যদ্রব্য সরাসরি কোনো গরিব ব্যক্তির মালিকানায় তুলে দিতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বা মসজিদের নির্মাণ কাজে বা সাধারণ খরচে ফিতরার টাকা ব্যয় করা যাবে না। যদি কোনো এতিমখানা বা মাদ্রাসায় এতিম শিশুদের খাবারের ব্যবস্থা থাকে, তবে সেখানে দেওয়া যাবে কারণ সেখানে শিশুদের মালিকানায় খাবার বা অর্থ পৌঁছানো হয়।
৭. বণ্টন পদ্ধতি
ফিতরা বণ্টনের ক্ষেত্রে ইসলামে নমনীয়তা রয়েছে…
* একজন ব্যক্তির ফিতরা একাধিক গরিবের মাঝে ভাগ করে দেওয়া যায়।
* আবার একাধিক ব্যক্তির ফিতরা মিলিয়ে একজন অভাবী মানুষকে দেওয়া যায় (যদি তাতে ওই গরিবের বিশেষ উপকার হয়)।
ইসলামী চিন্তাবিদদের পরামর্শ: ‘ফিতরা কেবল একটি দান নয়, এটি ধনীর সম্পদে গরিবের অধিকার। সমাজের অবহেলিত মানুষগুলো যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই সামাজিক ও ধর্মীয় দায়বদ্ধতা থেকেই ফিতরা আদায় করা উচিত।’