প্রকৃতি তার আপন খেয়ালে যেমন সৌন্দর্য বিলিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় কিছু প্রাণীকে দেয় অমোঘ মারণাস্ত্র। প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে অবস্থিত নিউগিনির গহীন রেইনফরেস্টে যখন কোনো অভিযাত্রী উজ্জ্বল কমলা আর কুচকুচে কালো রঙের এক অপূর্ব পাখিকে ডালে বসে থাকতে দেখেন, তখন মুগ্ধ হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এই মুগ্ধতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর মরণফাঁদ। বিজ্ঞানীদের কাছে এটি ‘হুডেড পিটোহুই’ নামে পরিচিত, যা পৃথিবীর হাতেগোনা কয়েকটি বিষাক্ত পাখির মধ্যে অন্যতম। আমার দীর্ঘ তিন দশকের সাংবাদিকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, প্রকৃতির এই ছোট ছোট বিস্ময়গুলো কীভাবে বিজ্ঞানের সংজ্ঞাকে বারবার চ্যালেঞ্জ জানায়।
বিষাক্ত অস্তিত্বের নেপথ্য কথা
দীর্ঘদিন ধরে পক্ষীবিদদের ধারণা ছিল যে বিষ কেবল সাপ বা কীটপতঙ্গের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়া একাডেমি অব সায়েন্সেসের গবেষক জ্যাক ডাম্বাকার দুর্ঘটনাবশত এই পাখির বিষাক্ত গুণের সন্ধান পান। তিনি যখন এই পাখিটিকে জাল থেকে মুক্ত করছিলেন, তখন তার আঙুলে আঁচড় লাগে এবং অজান্তেই তিনি সেই আঙুল মুখে দেন। মুহূর্তের মধ্যে তার ঠোঁট ও জিহ্বা অবশ হয়ে যায় এবং তীব্র জ্বালাপোড়া শুরু হয়। পরবর্তীতে নিবিড় গবেষণায় দেখা যায়, এই পাখির পালক, ত্বক এমনকি মাংসপেশিতেও রয়েছে ‘ব্যাট্রাকোটক্সিন’ নামক এক শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। মজার ব্যাপার হলো, এই একই বিষ পাওয়া যায় কলম্বিয়ার বিখ্যাত ‘পয়জন ডার্ট ফ্রগ’ বা বিষাক্ত ব্যাঙের শরীরে।
আহার থেকে আহরিত প্রতিরক্ষা
হুডেড পিটোহুইয়ের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো এদের বিষ তৈরির প্রক্রিয়া। গবেষক হিসেবে আমি যখন এদের খাদ্যাভ্যাস বিশ্লেষণ করি, তখন দেখা যায় এই পাখি জন্মগতভাবে বিষাক্ত নয়। মূলত এদের প্রধান খাদ্যতালিকায় থাকা ‘কোরিসিন’ গোত্রের কিছু বিশেষ বিটল বা গুবরে পোকা থেকেই এরা এই বিষ সংগ্রহ করে। বিটলগুলো খাওয়ার পর সেই বিষ পাখির শরীরে জমা হতে থাকে, যা তাদের কোনো ক্ষতি করে না কিন্তু পরজীবী এবং শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে তাদের সুরক্ষা দেয়। এটি বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানের এক অনন্য উদাহরণ, যেখানে একটি প্রাণী অন্য একটি প্রাণীর বিষকে নিজের আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
স্থানীয় লোকগাথা ও পরিবেশগত গুরুত্ব
নিউগিনির স্থানীয় আদিবাসীদের কাছে এই পাখিটি দীর্ঘকাল ধরেই পরিচিত। তারা একে ‘আবর্জনা পাখি’ বলে অভিহিত করে, কারণ এটি খাওয়ার অযোগ্য এবং এর গায়ের উৎকট গন্ধ দূর থেকে শিকারিকে সতর্ক করে দেয়। স্থানীয়রা ভুলেও এই পাখির ধারেকাছে ঘেঁষে না। বনের বাস্তুসংস্থানে এই বিষাক্ত পাখির উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিতে টিকে থাকার লড়াই কতটা জটিল হতে পারে। একটি সাধারণ পাখি শুধু রঙের বৈচিত্র্য দিয়ে নয়, বরং আণবিক স্তরের বিষ দিয়েও বনের রাজত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেহুডেড পিটোহুই সেই অজেয় শক্তিরই এক জীবন্ত প্রতীক।