ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়, এটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে বাহ্যিক সাজসজ্জা, সবক্ষেত্রেই রয়েছে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও সুন্নাহ। এরমধ্যে আংটি পরিধান করা অন্যতম একটি সুন্দর আমল। নবীজি (সা.) নিজের প্রয়োজনে আংটি ব্যবহার করতেন, যা পরবর্তী সময়ে উম্মতের জন্য একটি অনুসকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে।
নিচে আংটি ব্যবহারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, শরিয়তের বিধান ও নিয়মাবলি বিস্তারিত তুলে ধরা হলো…
আংটি ব্যবহারের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইসলামের প্রসারে আংটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল মূলত দাপ্তরিক প্রয়োজনে। নবী কারিম (সা.) যখন সমসাময়িক বিভিন্ন দেশের রাজন্যবর্গের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন সাহাবিরা জানান যে আরবের বাইরের শাসকরা সিলমোহর ছাড়া কোনো চিঠি গ্রহণ করেন না।
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) রুপার একটি আংটি তৈরি করান, যা রাষ্ট্রীয় সিলমোহর হিসেবে ব্যবহৃত হতো (সহিহ বুখারি: ৫৮৭০-৭২)। নবীজি (সা.)-এর ইন্তেকালের পর এই বরকতময় আংটিটি যথাক্রমে হযরত আবু বকর (রা.), হযরত ওমর (রা.) এবং হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে ছিল। পরবর্তীতে হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফতকালে অসাবধানতাবশত মদিনার ‘বিইরে আরিস’ নামক একটি কূপে আংটিটি পড়ে যায় এবং অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তা আর উদ্ধার করা যায়নি।
ধাতু ও ওজনের বিধান
পুরুষের জন্য স্বর্ণ নিষিদ্ধ: পুরুষদের জন্য সোনার আংটি বা যেকোনো অলংকার ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ। পুরুষরা কেবল রুপার আংটি পরতে পারবেন। ফকিহদের মতে, এই রুপার আংটির ওজন এক মিসকাল (প্রায় ৪.৩৭ গ্রাম)-এর কম হওয়া উচিত।
অন্যান্য ধাতু: লোহা, পিতল বা তামার আংটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামে কিছুটা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। তাই সর্বোত্তম ও নিরাপদ হলো রুপার আংটি বেছে নেওয়া।
নারীদের জন্য বিধান: নারীরা সোনা এবং রুপা— উভয় ধাতুর আংটিই অলংকার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। এতে কোনো বাধা নেই।
আংটি পরার সঠিক নিয়ম ও আঙুল নির্বাচন
কনিষ্ঠ আঙুল: পুরুষদের জন্য হাতের কনিষ্ঠা বা সবচেয়ে ছোট আঙুলে আংটি পরা সুন্নাহসম্মত।
যেসব আঙুলে নিষেধ: পুরুষদের জন্য তর্জনী (শাহাদাত আঙুল) এবং মধ্যমা (মাঝের আঙুল)-তে আংটি পরা অপছন্দনীয় বা মাকরুহ।
ডান নাকি বাম হাত: প্রিয় নবী (সা.) ডান এবং বাম উভয় হাতেই আংটি পরেছেন বলে হাদিসে প্রমাণ আছে। তবে আলেমদের মতে, কেবল সৌন্দর্যের জন্য পরলে ডান হাত এবং ব্যবহারের সুবিধার জন্য বাম হাত বেছে নেওয়া ভালো।
আকিদাগত সতর্কতা ও বিশ্বাস
আংটি পরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার নিয়ত ও বিশ্বাস। কোনো পাথর বা ধাতু মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে, রোগ ভালো করতে পারে কিংবা অলৌকিক কোনো ক্ষমতা রাখে, এমন বিশ্বাস রাখা সরাসরি শিরক-এর অন্তর্ভুক্ত। আংটি পরার পেছনের মূল উদ্দেশ্য হতে হবে সুন্নাহর অনুসরণ এবং মার্জিত সৌন্দর্য প্রকাশ।
আংটির নকশা কেমন হবে?
নবীজি (সা.)-এর রাষ্ট্রীয় আংটিতে তিন লাইনে ‘আল্লাহ-রাসুল-মুহাম্মদ’ খোদাই করা ছিল। তবে তিনি সাধারণ মানুষকে হুবহু তার সিলমোহরের অনুকরণ করতে বারণ করেছেন। তাই সাধারণ ও মার্জিত নকশার আংটি ব্যবহার করাই নিয়ম।