চায়ের পিয়াসি পিপাসিত চিত আমরা চাতক-দল/ দেবতারা কন সোমরস যারে, সে এই গরম জল… অর্থাৎ চাতক পাখি যেমন বৃষ্টির জলের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে, চা-প্রেমীরাও ঠিক তেমনি এক কাপ চায়ের অপেক্ষায় ব্যাকুল হয়ে থাকে। দেবতারা যাকে অমূল্য ‘সোমরস’ (দেবতাদের পানীয়) বলেন, সাধারণ চা-প্রেমীদের কাছে এই সাধারণ গরম জলই (চা) সেই সোমরসের সমান অমৃত। কাজী নজরুল ইসলামের ‘গীতি-শতদল’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত এই উল্লেখযোগ্য গান ‘চা-স্তোত্র’। এখানে চা খাওয়ার নেশা ও আসক্তিকে কৌতুকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন কবি।
গুগল বলছে, পৃথিবীতে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির চায়ের প্রচলন আছে। তবে আজ আমরা জানব দুধ চায়ের ইতিহাস। সকালে ঘুম ভাঙার পর, বিকেলে আড্ডায় কিংবা পড়ার ফাঁকে- অনেকেরই দুধ চা না হলে মোটেও জমে না! মজার বিষয় হলো চা এবং দুধের এই মিলন শুরুতে ছিল না। পৃথিবীতে প্রথম চা খাওয়া শুরু হয়েছিল সুদূর চীন দেশে কিন্তু দুধ ছাড়া।
চায়ের কাপে দুধ এল কেন?
মনে করা হয়, চায়ে দুধ যোগ করার ধারণাটির প্রথম উৎপত্তি হয়েছিল তিব্বতের হিমালয় অঞ্চলে। তিব্বতিরা ঐতিহ্যগতভাবে তাদের খাদ্যে অতিরিক্ত ক্যালোরি যোগ করার উপায় হিসেবে চায়ে ইয়াকের মাখন যোগ করত– যা পাহাড়ের তীব্র শীতের জন্য অপরিহার্য ছিল।

সকালে ঘুম ভাঙার পর, বিকেলে আড্ডায় কিংবা পড়ার ফাঁকে- অনেকেরই দুধ চা না হলে মোটেও জমে না!
ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে আসার আগে দুধ মেশানো সকালের চায়ের প্রচলন শুরু হয়েছিল ফ্রান্সে। তবে চায়ের সঙ্গে দুধ মেলানোর একটি বৈজ্ঞানিক কারণও ছিল! তখনকার দিনে চায়ের কাপগুলো এখনকার মতো উন্নত মানের ছিল না। ইউরোপে ব্যবহৃত অনেক কাপ ছিল সিরামিকের, যাতে খুব গরম চা ঢাললে ফেটে যেত। তাই অনেকে আগে কাপের মধ্যে একটু ঠান্ডা দুধ ঢেলে নিত, তারপর গরম চা ঢালত। এতে কাপ ফাটার ঝুঁকি কমে যেত।
‘মিল্ক ফার্স্ট’ না ‘টি ফার্স্ট’?
আরেকটি বহু পুরোনো বিতর্ক হলো ‘দুধ আগে নাকি চা আগে?’ ঐতিহাসিকভাবে, চীনামাটির পাত্রটি ফেটে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষার জন্য চায়ের সঙ্গে প্রথমে দুধ মেশালেও আধুনিক মগগুলোতে এর প্রয়োজন হয় না। তাই চায়ের তিক্ত স্বাদকে নরম করার জন্য এখন সাধারণত চায়ের পরে দুধ মেশানো হয়।
চায়ের ভেতরে থাকে ট্যানিন নামের একধরনের উপাদান, যা চাকে একটু তিতা করে। দুধ এই ট্যানিনের প্রভাব কমিয়ে দেয়, ফলে চা হয় মোলায়েম আর ক্রিমি। তাই যারা খুব ‘র’ (Raw) চা পছন্দ করে না, তাদের জন্য দুধ চা একদম পারফেক্ট।

আরেকটি বহু পুরোনো বিতর্ক হলো ‘দুধ আগে নাকি চা আগে?’
রাজকীয় ট্রেন্ড
দুধ শুধু কাপ বাঁচাতেই সাহায্য করেনি, চায়ের স্বাদও বদলে দিয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে ‘মিল্ক টি’ এক ধরনের ফ্যাশন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ব্রিটিশ রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে। ধীরে ধীরে দুধ চা ব্রিটিশ সংস্কৃতির একটি অংশ হয়ে যায়। ‘আফটারনুন টি’ বা বিকেলের চা— এই অভ্যাস ব্রিটেনে খুব বিখ্যাত।
এই ট্রেন্ড জনপ্রিয় করেন আন্না, ডাচেস অব বেডফোর্ড। তিনি বিকেলে হালকা ক্ষুধা মেটাতে চা আর হালকা খাবার খেতেন। এরপর সেটা সামাজিক আড্ডায় পরিণত হয়। এই সময়ের চা সাধারণত দুধ চা-ই হতো।
আমাদের দুধ চা
এবার আসি আমাদের পরিচিত দুধ চায়ে। ব্রিটিশরা যখন ভারতীয় উপমহাদেশে আসে, তারা এখানে চা চাষ শুরু করে— বিশেষ করে আসাম ও দার্জিলিংয়ে। কিন্তু শুরুতে স্থানীয় মানুষ চা খেতে আগ্রহী ছিল না। তাই চা কোম্পানিগুলো নতুন কৌশল নেয়— চায়ের সঙ্গে দুধ, চিনি আর মশলা মিশিয়ে এক নতুন স্বাদ তৈরি করে। এভাবেই জন্ম নেয় আমাদের ‘মশলা–চা’ বা ‘দুধ চা’।

এই ট্রেন্ড জনপ্রিয় করেন আন্না, ডাচেস অব বেডফোর্ড। তিনি বিকেলে হালকা ক্ষুধা মেটাতে চা আর হালকা খাবার খেতেন
আজকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানে এই পানীয় শুধু জনপ্রিয়ই নয়, এটা একটি সংস্কৃতি। রিকশার পাশে, টং দোকানে কিংবা বাসার বারান্দায়— সব জায়গায় এর রাজত্ব।
চীনের পাহাড় থেকে জন্ম নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ঘুরে আজ পাড়াগাঁয়ের টং দোকানে দুটি পাতা একটি কুঁড়ির যে গল্প, তা কোনো সাধারণ গল্প নয়, বরং ইতিহাস-ঐতিহ্য সমৃদ্ধ একটু নরম, একটু মিষ্টি, একটু আলস্যে মেশানো কোনো আরামদায়ক গল্প।