ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে অনেক ব্যক্তিত্ব আবির্ভূত হন ঝড়ের মতো, রাতারাতি হয়ে ওঠেন তারকা। তারপর সেই তারা ঠিক ‘সন্ধ্যাতারার’ মতই অল্প সময়ের জন্য আকাশে বিরাজমান থাকেন— এবং ঠিক ততটাই আকস্মিকভাবে অদৃশ্য হয়ে যান। দর্শকদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে রেখে যান, ‘তাদের কী হলো?’ এমনই একটি নাম রাগেশ্বরী।
‘পাস হুয়ানে লাগে জারা জারা/ নাজরে চুরানে লাগে জারা জারা…’ নব্বইয়ের দশকে বাজিমাত করা সেই গানে সাইফ আলি খানের নায়িকা হয়ে মিষ্টি চেহারার মেয়েটি দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন ঠিক যেন গানের কথাগুলোর মতই। তার পুরো নাম রাগেশ্বরী লুম্বা। রাগেশ্বরী মডেল হিসেবে অভিনয়ের জগতে প্রবেশ করেন এবং মাত্র ১৬ বছর বয়সে গোবিন্দা ও চাংকি পান্ডে অভিনীত ‘আঁখে’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন।

নব্বইয়ের দশকে বাজিমাত করা গানে সাইফ আলি খানের নায়িকা হয়ে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছিলেন রাগেশ্বরী।
নব্বইয়ের দশকের সেনসেশনাল অভিনেত্রীর পাশপাশি তিনি ছিলেন জনপ্রিয় একজন গায়িকা। ১৯৭৫ সালে মুম্বইয়ে জন্ম রাগেশ্বরীর। বাবা ছিলেন গায়ক। ছোটবেলা থেকে তাই রাগেশ্বরীরও গানের প্রতি ভালবাসা ছিল। এক সময়ে গানের অ্যালবাম বের করে রাতারাতি হিটও হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎই যেন হারিয়ে যান। তার জীবনে কী ঘটেছিল? এখন রাগেশ্বরী কোথায় রয়েছেন? পাঠকদের সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি আমরা…
রাগেশ্বরীর প্রথম ছবি ‘আঁখে’ মুক্তি পায় ১৯৯৩ সালে। সেই বছরের অন্যতম সর্বোচ্চ আয়করা ছবি ছিল ‘আঁখে’ যা তাকে তারকাখ্যাতি এনে দেয়। প্রথম ছবি থেকেই জনপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন রাগেশ্বরী। তারপরও বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেছেন রাগেশ্বরী। পরবর্তীতে তিনি ‘ম্যায় খিলাড়ি তু অনারি’ ছবিতে অভিনয় করেন, যেখানে তিনি অক্ষয় কুমারের বোন এবং সাইফ আলি খানের প্রেমিকার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। এই ছবির জনপি্রয় গান ‘জারা জারা’ সেইসময় তরুনদের মুখে মুখে ফিরতো। তার ফিল্ম সংখ্যায় হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু ওই অল্পেতেই অসংখ্য মানুষের মনে বাসা বেঁধে ফেলেছিলেন রাগেশ্বরী। ‘জিদ’, ‘মুম্বই সে আয়া মেরা দোস্ত’ ফিল্মে দেখা গিয়েছে তাকে। সব মিলিয়ে মাত্র ছয়টি ছবিতে অভিনয় করেছেন রাগেশ্বরী।
এ ছাড়াও বেশ কিছু টেলিভিশন শোয়ে অভিনয় করেছেন তিনি। তার কর্মজীবনে, রাগেশ্বরী ‘বার বার দেখো’, ‘এমটিভি এক দো তিন’, ‘কুছ কেহতি হ্যায় ইয়ে ধুন’সহ আরও বেশ কয়েকটি টিভি শো সঞ্চালনা করেছেন। এছাড়াও, রাগেশ্বরী ‘হার্ট থ্রবস: হৃতিক রোশন ওয়ার্ল্ড ট্যুর লাইভ’ কনসার্টের অন্যতম শিল্পী ছিলেন। তিনি বিগ বসের পঞ্চম সিজনে অংশ নিয়েছিলেন এবং এই অনুষ্ঠানের একজন প্রাক্তন প্রতিযোগীও ছিলেন।

নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় পপস্টার হয়ে উঠেছিলেন তিনি…
‘দুনিয়া’ তাকে পপ জগতের সেনশনে পরিণত করেছিল
সিনেমার সাফল্য তাকে রাতারাতি পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে। কিন্তু অভিনয় ছিল তার প্রতিভার একটি মাত্র দিক। একসময় ফিল্ম থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে সঙ্গীতচর্চায় মনোনিবেশ করেন রাগেশ্বরী। মাত্র ২২ বছর বয়সে তিনি নিজে গান লিখে এবং গেয়ে অ্যালবাম বার করেন। রাতারাতি তার অ্যালবাম তাকে গায়িকা হিসাবেও জনপ্রিয় করে তুলেছিল। নব্বইয়ের দশকের সবচেয়ে জনপ্রিয় পপস্টার হয়ে উঠেছিলেন তিনি। প্রচুর শো, কনসার্টে ডাক পেতে শুরু করেন তিনি। শীঘ্রই তিনি ১৯৯০-এর দশকের একজন পপ আইকন হিসেবে আবির্ভূত হন এবং ‘দুনিয়া’, ‘পেয়ার কা রাগ’, ‘সচ কা সাথ’ ও ‘ওয়াইটুকে – সাল দো হাজার’-এর মতো চার্ট-টপিং অ্যালবাম উপহার দেন। এছাড়াও তিনি এমটিভি-র ‘ভিজে’ হিসেবে ঘরে ঘরে পরিচিতি লাভ করেন এবং চ্যানেলটির অন্যতম জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘এক দো তিন উইথ রাগেশ্বরী’ তার মধ্যে অন্যতম ছিল।
২৫ বছর বয়সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন রাগেশ্বরী
এত জনপ্রিয়তার মধ্যে তার জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়ংকর দিন। সে দিন একটি স্কুলের চ্যারিটি শো-এ তার পারফর্ম করার কথা ছিল। সকালে ঘুম থেকে উঠেই একটু অন্যরকম লাগছিল তার। নিজের মধ্যে কিছু বদলে গেছে মনে হচ্ছিল। সকালে ব্রাশ করতে গিয়েই টের পেলেন অসুখটা। রাগেশ্বরীর জীবন পুরোপুরি ঘুরে যায় সেইদিন তার মুখের একটা দিক পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মুখের ভিতরে পানিও ধরে রাখতে পারছিলেন না তিনি। তারপরের দিনগুলো পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল রাগেশ্বরীর। ঘর আর হাসপাতাল— এটাই হয়ে গিয়েছিল তার জীবন।
২৫ বছর বয়সে রাগেশ্বরীর বেল’স পালসি রোগ ধরা পড়ে। এই রোগে তার মুখের বাম পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং তার কথা জড়িয়ে যেত। এই অসুস্থতার কারণে তিনি চার বছর শয্যাশায়ী ছিলেন। এই সময়ে তিনি ফিজিওথেরাপি এবং যোগব্যায়ামের সাহায্য নেন।

জেদ, ফিজিওথেরাপি আর যোগব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসকদের অবাক করে খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠেছিলেন রাগেশ্বরী।
ইনস্টাগ্রামের একটি ক্যাপশনে এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে রাগেশ্বরী বলেন, ‘২০০০ সালে মুখের পক্ষাঘাতের সময় আমি যোগব্যায়াম শুরু করি। শত শত ছাত্রছাত্রীতে ভরা একটি ক্লাসে আমি আমার বাঁকা মুখ আর মনমরা ভাব নিয়ে যেতাম।’
তার কঠোর যোগগুরুদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘তারা আমাকে শিখিয়েছেন যে যোগ মানে নিজের ভেতরে তাকানো, আমার ভেতরের সত্তাকে জাগিয়ে তোলা। নিজের ভুল ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার করার পাশাপাশি নিজের শক্তিগুলোকে প্রশংসা করার জন্য আমাকে নম্রতা তৈরি করতে হয়েছিল।’
জেদ, ফিজিওথেরাপি আর যোগব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিত্সকদের অবাক করে খুব তাড়াতাড়ি সেরে উঠেছিলেন রাগেশ্বরী। ফের নতুন করে শুরু করেন গান। পরে সুস্থ হয়ে নিজেই তার অসুস্থতার কথা এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন রাগেশ্বরী। কথা বলার সময় তার মুখ এতটাই বেঁকে যেত যে, তা কান পর্যন্ত চলে যেত। নিজেকেই তখন চিনতে পারতেন না। কথা বলতে পারতেন না। ফের যে কখনও গাইতে পারবেন, তা ভাবতেও পারতেন না সেই সময়।
যোগ তার জীবন ও কর্মজীবন বদলে দিয়েছে
রাগেশ্বরী তার একটি পোস্টে উল্লেখ করেছেন, যোগ আমার কাছে কখনোই শুধু ব্যায়াম ছিল না, বরং ছিল এক ধরনের আত্মিক অনুশীলন। আমি কেবল স্বাস্থ্যগত কারণে যোগ অনুশীলন করতাম, এবং হ্যাঁ, এটি আমার স্বাস্থ্য, ফিটনেস এবং নমনীয়তা বদলে দিয়েছে। কিন্তু এটি আমার জীবনের অন্য সবকিছুও বদলে দিয়েছে। এটি আমাকে নিজের এবং অন্যদের জন্য নম্রতা, গ্রহণযোগ্যতা, দয়া, সরলতা এবং ধৈর্যের উজ্জ্বল পথ দেখিয়েছে।

আমরা সম্পদের চেয়ে সচ্চরিত্রকে, ক্ষমতার চেয়ে ভালোবাসাকে এবং লন্ডনের জমকালো রেস্তোরাঁর চেয়ে বনভোজনকে বেশি গুরুত্ব দিই…
রাগেশ্বরী নিজেকে একজন মাইন্ডফুলনেস এবং ম্যানিফেস্টেশন কোচ হিসেবে নতুন করে গড়ে তুলেছেন এবং তার অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা ও আলোচনার মাধ্যমে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলেছেন। এর মাঝে তিনি পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার সঙ্গে একজন লেখক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন।
লন্ডনে গমন, ৩৯ বছর বয়সে বিবাহ
এক সাক্ষাত্কারে এমনটাই জানিয়েছিলেন, ৩৬ বছর পর্যন্ত জীবন সঙ্গী খুঁজে না পেয়ে বাবা-মাকেই সে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ২০১২ সালে তিনি লন্ডনে চলে যান, যেখানে তার বর্তমান স্বামী সুধাংশু স্বরূপ কেসি-র সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তিনি লন্ডনে বসবাসকারী একজন মানবাধিকার আইনজীবী। ২০১৪ সালে তারা বিয়ে করেন।
তাদের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে রাগেশ্বরী একবার বলেছিলেন, ‘জন্মদিনের বার্তা বা বিবাহবার্ষিকীর শুভেচ্ছা জানানোর প্রয়োজন বোধ করিনি, কারণ আমরা দুজনেই বাচ্চাদের মতো একে অপরকে হাতে লেখা চিঠি পাঠাই। সেও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুপস্থিত, তাই এখানে বার্তা পোস্ট করাটা অদ্ভুত মনে হবে।’

রাগেশ্বরী প্রতি বছর তার মেয়েকে নিয়ে ভারতে বেড়াতে আসেন
তিনি আরও বলেন, যখন আমাদের বিয়ে হয়, তখন আমার বয়স ছিল ৩৯ এবং সুধাংশুর ৪১। আমার প্রিয় ননদ নিধি এবং আমাদের বাবা-মা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আমরা ছয় মাস ধরে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রেখেছিলাম— যা ছিল হতাশাজনকভাবে ধীরগতির। অবশেষে যখন আমাদের কথা হলো, মনে হলো যেন ঘরে ফিরে এলাম। আমরা সম্পদের চেয়ে সচ্চরিত্রকে, ক্ষমতার চেয়ে ভালোবাসাকে এবং লন্ডনের জমকালো রেস্তোরাঁর চেয়ে বনভোজনকে বেশি গুরুত্ব দিই।
রাগেশ্বরীর সরল মন্ত্র
রাগেশ্বরী প্রতি বছর তার মেয়েকে নিয়ে ভারতে বেড়াতে আসেন। রাগেশ্বরীর নিজের কোনো গাড়িও নেই। প্রতিদিন মেয়েকে হেঁটে স্কুলে নিয়ে যান। গণপরিবহন ব্যবহার করেন। শুধু যখন কোনো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা বা পরিবেশন করেন, তখনই কালো ট্যাক্সি নেন। প্রতিদিন তিনি শেখেন কীভাবে সাদামাটা জীবনের শান্ত পথে চলতে হয়।

প্রতিদিন তিনি শেখেন কীভাবে সাদামাটা জীবনের শান্ত পথে চলতে হয়
এই সবকিছুর মাঝেও, রাগেশ্বরী চাকচিক্যময় জগতের কোলাহল ও ব্যস্ততা থেকে দূরে এক সরল জীবনযাপনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
তথ্যসূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া.কম
লেখক: নিউজরুম এডিটর, সারাবাংলা ডটনেট