জানালার ওপারে ঢাকা শহরের চেনা ব্যস্ততা। রিকশার টুংটাং আর ট্রাফিক জ্যামের শব্দ। জীবনটা অনেকটাই একঘেয়ে। টেবিলের কোণে পড়ে থাকা ধুলোমাখা বইটির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ নীরা’র মনে হলো, ‘শেষ কবে নিজের জন্য কিছু পড়েছি?’ বুকশেলফ থেকে বের করলো দীর্ঘকাল অবহেলায় পড়ে থাকা একগুচ্ছ কবিতার বই। প্রথম পাতাটি খুলতেই যেন বাইরের জগতের কোলাহল স্তব্ধ হয়ে গেল। শব্দের প্রতিটি বাঁকে লুকিয়ে থাকা এক একটি ছবি যেন জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল।
আজ ২৮ এপ্রিল, ক্যালেন্ডার হয়তো বলছে এটি কেবলই আরেকটি কাজের দিন, কিন্তু মনের আয়নায় এটি এক অন্যরকম উৎসবের দিন ‘গ্রেট পোয়েট্রি রিডিং ডে’। আজ কবিতার জাদুকরদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তাদের রেখে যাওয়া অমূল্য পঙক্তিগুলোকে পুনরায় প্রাণ দেওয়ার দিন।
কবিতার সাথে মনস্তাত্ত্বিক টান
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, কবিতা পড়ার সময় মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ সক্রিয় হয় যা আমাদের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে। কবিতা আমাদের জীবনের গভীর অনুভূতিগুলোকে এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার সাহস জোগায়। বিখ্যাত কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়ার তার অমর সৃষ্টিতে বলেছিলেন: ‘Love looks not with the eyes, but with the mind; And therefore is wing’d Cupid painted blind.’
অর্থাৎ, ‘ভালোবাসা চোখ দিয়ে নয়, বরং মন দিয়ে দেখতে হয়।’
কবিতার এই ছন্দ আমাদের যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করে। তথ্যের ভারে জর্জরিত এই যুগে কবিতার নিস্তব্ধ এবং গভীর শব্দগুলো আমাদের মনের খোরাক হয়ে ওঠে।
বিশ্বসাহিত্যের ছন্দ ও আমাদের আবেগ
কবিতা কেবল শব্দের গাঁথুনি নয়, এটি ইতিহাসের সাক্ষী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতার মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন জীবনের আনন্দ আর বিষাদের ভারসাম্য। তিনি লিখেছেন:
‘মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি। আজ আমাদের ছুটি।’
প্রকৃতি এবং জীবনের এই ছোট ছোট মুহূর্তের উপলব্ধিই কবিরা তাদের সৃজনশীলতা দিয়ে অমর করে রেখেছেন। তেমনি বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের শিখিয়েছেন সাহসের নতুন সংজ্ঞা।
তিনি লিখেছিলেন: ‘বল বীর, বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির!’
কবিতার এই পঙক্তিগুলো আমাদের সংকটের দিনে নতুন করে বাঁচার প্রেরণা দেয়।
কবিতার সেতুবন্ধন ও আজকের উদযাপন
কবিতার এই ধারা কেবল এক অঞ্চলের নয়, বরং বিশ্বজনীন। বিখ্যাত আমেরিকান কবি রবার্ট ফ্রস্ট তার ‘দ্য রোড নট টেকেন’ কবিতায় লিখেছিলেন:
‘Two roads diverged in a wood, and I took the one less traveled by, And that has made all the difference.’
জীবনে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব তিনি মাত্র কয়েক লাইনে যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অনন্য। আজকের এই দিনে এমন অমর কবিদের সৃষ্টি পাঠ করে আমরা নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি। এই দিবসটি পালনের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই; আপনার প্রিয় কবির বই আজ হাতে তুলে নিন এবং নিজেকে শব্দের এই ছন্দে ডুবিয়ে দিন। কবিতা পড়ার জন্য কোনো বিশাল মঞ্চের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো নিরিবিলি এক কোণে একা বসে কবিতা পড়াটাই হয়ে উঠতে পারে জীবনের অন্যতম সেরা অভিজ্ঞতা। শব্দের এই ছন্দে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়ে আজ যান্ত্রিকতা থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করুন।