Wednesday 29 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

মেঝের ওপর ছন্দের কারুকাজে জাদুকরী ‘ট্যাপ ডান্স’

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:২৯

স্তব্ধ এক শান্ত ঘর। হঠাতই কাঠের মেঝের ওপর একটা শব্দ হলো ‘ট্যাপ’। ঠিক যেন কোনো গোপন সংকেত। পরক্ষণেই শব্দের জোয়ার। কখনও দ্রুত, কখনও ধীর, কখনও বা হারানো কোনো সুরের প্রতিধ্বনি। কোনো বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই যেন তৈরি হচ্ছে এক অবিস্মরণীয় কনসার্ট। মেঝেতে পায়ের আলতো ছোঁয়া আর জুতার হিল-টো-এর সংঘর্ষে যে সুর সৃষ্টি হয়, তাকেই আমরা বলি ‘ট্যাপ ডান্স’। এটি কেবল নাচ নয়, বরং শরীর আর মেঝের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া এক জীবন্ত ছন্দ। প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল যখন বিশ্বজুড়ে ‘আর্টিস্টিক ট্যাপ ডান্স ডে’ পালন করা হয়, তখন মূলত পায়ের আঙুলের ডগায় তৈরি হওয়া সেই শিল্পকেই কুর্নিশ জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

ইতিহাস ও ধুলোমাখা শেকড়ের গল্প

ট্যাপ ডান্সের শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এটি কোনো একজন ব্যক্তির আবিষ্কৃত নাচ নয়, বরং কয়েকশ বছর আগে বিভিন্ন সংস্কৃতির সংমিশ্রণে এর জন্ম। বিশেষ করে ১৭০০ শতকের দিকে আফ্রিকান এবং আইরিশ নাচের শৈলী যখন এক বিন্দুতে এসে মিলেছিল, তখন থেকেই এই বিচিত্র ফর্মটি গড়ে উঠতে শুরু করে। আফ্রিকান ড্রামিং এবং আইরিশ জিগ বা ক্লগিংয়ের সেই অদ্ভুত মিশেল আজ আধুনিক ট্যাপ ডান্সে রূপ নিয়েছে। শুরুতে এটি ছিল সাধারণ মানুষের বিনোদনের মাধ্যম, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ তাদের ক্লান্তি দূর করতে মেঝের ওপর পায়ের ছন্দ তুলতেন। পরবর্তীতে ১৮০০ এবং ১৯০০ শতকের শুরুর দিকে এটি ভাউডেভিল এবং ব্রডওয়ের মঞ্চে রাজত্ব শুরু করে। কালক্রমে এটি সাধারণ বিনোদন থেকে হয়ে ওঠে উচ্চমার্গীয় একটি শৈল্পিক উপস্থাপনা, যা আজ আমাদের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ট্যাপ জুতার ভেতরে লুকানো বিজ্ঞানের কেরামতি

ট্যাপ ডান্সের মূল আকর্ষণ এর শব্দ, আর এই শব্দের কারিগর হলো বিশেষ ধরনের এক জোড়া জুতা। এই জুতোগুলো সাধারণ জুতোর মতো নয়। এর সোলের নিচের অংশে বিশেষ করে আঙুলের ডগায় এবং গোড়ালির নিচে দুটি পাতলা ধাতব পাত বসানো থাকে। এই পাতগুলোই মূলত শব্দকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন নৃত্যশিল্পী তার পা মেঝের ওপর ফেলেন, তখন ধাতব পাতের কম্পন এবং মেঝের প্রতিধ্বনি মিলেমিশে এক চমৎকার ছন্দ তৈরি করে। এই জুতোর সঠিক ব্যবহার শেখার জন্য দীর্ঘ সাধনার প্রয়োজন। এটি কেবল পা ছুড়ে দেওয়া নয়, বরং পায়ের প্রতিটি সূক্ষ্ম সঞ্চালনের মাধ্যমে আলাদা আলাদা স্বর বা ‘নোট’ তৈরি করা। একজন দক্ষ ট্যাপ ডান্সার তার পায়ের মাধ্যমে ড্রাম সেটের মতো নিখুঁত বিট তৈরি করতে পারেন, যা শ্রোতাদের মুগ্ধ না করে ছাড়ে না।

সৃজনশীলতা ও শৈল্পিক প্রকাশের নতুন দিগন্ত

ট্যাপ ডান্সকে কেন ‘আর্টিস্টিক’ বা শৈল্পিক বলা হয়, তার পেছনে রয়েছে এর অবারিত সৃজনশীলতা। একজন ট্যাপ ডান্সার যখন নাছেন, তিনি কেবল শারীরিক ব্যায়াম করেন না, বরং তিনি একজন সঙ্গীতশিল্পীও বটে। অনেক সময় কোনো গান বা বাদ্যযন্ত্র ছাড়াই তারা পারফর্ম করেন, যেখানে তাদের পায়ের শব্দই হয় একমাত্র মিউজিক। এই নাচে ইম্প্রোভাইজেশন বা তাৎক্ষণিক উদ্ভাবনার সুযোগ অনেক বেশি। নাচের মাঝখানে শিল্পী চাইলে তার নিজস্ব কোনো ছন্দ যোগ করতে পারেন, যা অন্য কোনো নাচের ধরনে সচরাচর দেখা যায় না। এর মাধ্যমে একজন শিল্পী তার দুঃখ, আনন্দ বা জীবনের গল্পগুলো মেঝের প্রতিটি ঠোকরে ফুটিয়ে তোলেন। এই শৈল্পিক প্রকাশের কারণেই ২৮ এপ্রিলের দিনটি সারা বিশ্বের শিল্পীদের কাছে এত বিশেষ।

আধুনিক মঞ্চে ট্যাপ ডান্সের প্রাসঙ্গিকতা

আজকের যুগে ট্যাপ ডান্স কেবল পুরনো সাদাকালো সিনেমার দৃশ্য বা ধুলো জমা ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নেই। হলিউডের বড় বড় মিউজিক্যাল ফিল্ম থেকে শুরু করে আধুনিক হিপ-হপ মিউজিক ভিডিও পর্যন্ত সবখানেই ট্যাপ ডান্সের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। ফ্রড অ্যাস্টেয়ার থেকে শুরু করে বিল ‘বোজ্যাঙ্গেলস’ রবিনসনের হাত ধরে যে শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা জ্যাজ এবং পপ কালচারের সাথে মিশে গেছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন নাচের স্কুল ও থিয়েটারে এখন নিয়মিত ট্যাপ ডান্স শেখানো হয়। এই বিশেষ দিনটিতে বিশ্বের নানা প্রান্তের নৃত্যশিল্পীরা রাস্তায় বা স্টুডিওতে নেমে আসেন তাদের পায়ের জাদুকরী শব্দ ছড়িয়ে দিতে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সুন্দর কিছু সৃষ্টি করার জন্য সবসময় দামি বাদ্যযন্ত্র লাগে না, কখনো কখনো এক জোড়া জুতা আর একটু সৃজনশীল ইচ্ছাই যথেষ্ট।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর