প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম অত্যন্ত ভক্তি ও শ্রদ্ধা নিয়ে পবিত্র কাবার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন। আর যারা হজ বা ওমরাহ করতে মক্কায় যান, তারা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন কাবার কালো গিলাফের ওপর সোনালি সুতোয় বোনা অপূর্ব আরবি ক্যালিগ্রাফির দিকে। রেশমি কাপড়ের ওপর স্বর্ণ আর রুপার প্রলেপ দেওয়া সুতোর সেই নিখুঁত লেখনশৈলী শুধু ধর্মীয় পবিত্রতার প্রতীক নয়, বরং তা ইসলামী শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন। তবে চোখের সামনে ভেসে থাকা এই অনিন্দ্য সুন্দর শিল্পকর্মের পেছনে যিনি নিজের পুরো জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন, সেই নেপথ্য কারিগরকে অনেকেই চেনেন না। তিনি হলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রখ্যাত ক্যালিগ্রাফার আবদুর রহিম আমিন বুখারি, যাঁর হাতের ছোঁয়ায় পবিত্র কাবার গিলাফ এবং দরজা এক ঐতিহাসিক ও নান্দনিক রূপ পেয়েছিল।
মক্কার আলো-বাতাসে ক্যালিগ্রাফির হাতেখড়ি
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে পবিত্র মক্কা নগরীর এক ধার্মিক ও শিল্পমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহিম আমিন বুখারি। ছোটবেলা থেকেই মক্কার মসজিদ, চারপাশের ইসলামী স্থাপত্য এবং আরবি হরফের নান্দনিক লেখনশৈলী তাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করত। শৈশবের সেই মুগ্ধতাই পরবর্তীতে তার জীবনের একমাত্র সাধনায় পরিণত হয়। ১৯২৭ সালে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ যখন কাবার গিলাফ বা কিসওয়া তৈরির জন্য প্রথম রাষ্ট্রীয় কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন, তখন একদম তরুণ বয়সেই সেখানে যোগ দেন বুখারি। কারখানার অভিজ্ঞ ক্যালিগ্রাফারদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে তিনি আরবি হরফের জ্যামিতিক পরিমাপ, নিখুঁত ভারসাম্য এবং ক্যালিগ্রাফির সূক্ষ্ম নিয়মগুলো একে একে রপ্ত করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের মেধা ও কঠোর পরিশ্রমের জোরে তিনি কিসওয়া কারখানার অন্যতম প্রধান কারিগর এবং নকশাকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
সুলুস লিপির জাদু এবং কাবার ঐতিহাসিক দরজা
আরবি ক্যালিগ্রাফির সবচেয়ে রাজকীয়, জটিল এবং মর্যাদাপূর্ণ শৈলী হলো থুলুথ বা সুলুস লিপি। আবদুর রহিম বুখারি এই কঠিন লিপিশৈলীতে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। কাবার গিলাফের চারপাশের বেল্ট বা হিজাম অংশে সোনা ও রুপার সুতো দিয়ে কোরআনের আয়াত ফুটিয়ে তোলার জন্য তিনি নিজ হাতে মূল নকশাগুলো তৈরি করতেন। শুধু গিলাফই নয়, কাবার দরজাতেও তার কালজয়ী শিল্পের স্বাক্ষর রয়েছে। ১৯৪৪ সালে বাদশাহ আব্দুল আজিজ কাবার জন্য একটি নতুন আলংকারিক দরজা নির্মাণের নির্দেশ দিলে এর ওপর পবিত্র ক্যালিগ্রাফি খোদাই করার গুরুদায়িত্ব পান আবদুর রহিম বুখারি। তার নিখুঁত হাতে নকশা করা আল্লাহর নাম, কালেমা এবং কোরআনের আয়াতগুলো ধাতুর পাতে খোদাই করে ১৯৪৭ সালে সেই ঐতিহাসিক দরজা স্থাপন করা হয়েছিল, যা আজও পরবর্তী দরজার মূল নকশার অনুপ্রেরণা হিসেবে টিকে আছে।
কিসওয়ার ভাঁজে অমর হয়ে থাকা বিরল স্বীকৃতি
আবদুর রহিম আমিন বুখারি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন পবিত্র কাবার সেবায় নিয়োজিত এক নিবেদিতপ্রাণ সাধক। সৌদি আরবের বহু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা, মসজিদের পর্দা এবং রাষ্ট্রীয় অলংকরণে তার তৈরি লেখনশৈলী ব্যবহার করা হয়েছে। তার এই অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কিসওয়া তৈরির ইতিহাসে তাকে এক বিরল সম্মান দেওয়া হয়েছিল। কাবার গিলাফের নিচের অংশের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে তার নাম বা স্বাক্ষর যুক্ত করার অনুমতি দেওয়া হয়, যা একজন ক্যালিগ্রাফারের জন্য সর্বোচ্চ মর্যাদার প্রতীক। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে মক্কায় এই মহান শিল্পীর জীবনাবসান ঘটলেও তার তৈরি করা শিল্প আজও লাখো মানুষের চোখে বিস্ময় জাগায়। প্রতি বছর যখন নতুন কিসওয়ায় কাবা শরিফকে আবৃত করা হয়, তখন সেখানে মিশে থাকে আবদুর রহিম বুখারির আজীবনের সাধনা ও ভালোবাসার এক পবিত্র স্মৃতি।