Sunday 24 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

শান্তির কারিগর যখন নারী

ফারহানা নীলা সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট
২৪ মে ২০২৬ ২০:২০ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ২০:২৩

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে যুদ্ধের যে চিরচেনা ছবিটা আমাদের চোখে ভেসে ওঠে, তা মূলত পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার আস্ফালন, কামানের গর্জন আর বারুদের গন্ধ। কিন্তু সেই ধ্বংসস্তূপের সমান্তরালে আরেকটি নীরব লড়াই চলে। যে লড়াই জীবন বাঁচানোর লড়াই, ভাঙা সংসার জুড়ে দেওয়ার লড়াই, আর বুলেটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে শান্তি চেয়ে নেওয়ার লড়াই। সেই লড়াইটি, কতটুকু আলো পায়?

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ আর অস্ত্রের উন্মাদনার বিরুদ্ধে নারীদের এই যে আদিম ও শাশ্বত প্রতিরোধ, তাকেই কুর্নিশ জানানোর একটি উপলক্ষ এই মে মাস। তবে ক্যালেন্ডারের পাতার কোনো নির্দিষ্ট দিন দিয়ে এই সুরকে বেঁধে রাখা কঠিন; কারণ অস্ত্রের অহংকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নারীদের শান্তির এই অন্বেষণ প্রতিদিনের, প্রতি মুহূর্তের।

বিজ্ঞাপন

সভ্যতার সূচনা থেকেই সমাজ গঠনে নারীদের ভূমিকা যতটা না শক্তির, তার চেয়ে অনেক বেশি স্থিতি ও মমতার। অথচ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যখন কোনো জনপদ রণক্ষেত্রে পরিণত হয়, তার সবচেয়ে বড় মূল্য শুধরাতে হয় এই নারীদেরই। ঘর হারানো, স্বজন হারানো কিংবা যুদ্ধকালীন সহিংসতার শিকার হওয়া এই নারীদের ওপরেই আসে সবচেয়ে বড় আঘাতটা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই চরম নিপীড়নের ভেতর থেকেও নারীরা কখনো ধ্বংসের গান গাননি, বরং সবসময় গেয়েছেন পুনর্গঠনের গান। যেখানে পুরুষেরা যুদ্ধের কৌশল সাজাতে ব্যস্ত থাকেন, সেখানে নারীরা খুঁজে বেড়ান কীভাবে শান্তি ফিরিয়ে এনে পরবর্তী প্রজন্মকে একটি নিরাপদ পৃথিবী উপহার দেওয়া যায়। অস্ত্রের ঝনঝনানি থামিয়ে আলোচনার টেবিলে ফেরার আকুতিটা তাই সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় মায়ের কণ্ঠে, বোনের হাত ধরে।

ইতিহাস সাক্ষী, বিশ্বের যেখানেই যুদ্ধ বা সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে, সেখানেই নারীরা মানব ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছেন। লাইবেরিয়ার গৃহযুদ্ধের কথাই ধরা যাক। যখন বছরের পর বছর চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাত কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না, তখন শ্বেতবস্ত্র পরিহিত হাজার হাজার নারী রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। তারা শুধু প্রার্থনাই করেননি, বরং দুই পক্ষকে শান্তিতে বাধ্য করতে অহিংস আন্দোলনের এক অভূতপূর্ব নজির গড়েছিলেন। ঠিক একইভাবে কঙ্গো থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য কিংবা লাতিন আমেরিকার অশান্ত জনপদে নারীরা বারবার প্রমাণ করেছেন, শক্তির জোরে সাময়িক জয় আসলেও, স্থায়ী শান্তি আসে কেবল পারস্পরিক বোঝাপড়া ও মমত্ববোধের হাত ধরে। যুদ্ধ যেখানে বিভেদ তৈরি করে, নারী সেখানে গড়ে তোলেন সেতু।

বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও এই সংকট ফুরিয়ে যায়নি, বরং রূপ বদলেছে। একদিকে মারণাস্ত্রের প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ছোট-বড় আঞ্চলিক সংঘাত কোটি মানুষের জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে নারী অধিকার কর্মী এবং সাধারণ নারীরা একটিই দাবি তুলছেন, অস্ত্রের পেছনে বিপুল অর্থের অপচয় বন্ধ করে সেই অর্থ বিনিয়োগ করা হোক শিক্ষা, স্বাস্থ্য আর জলবায়ু পরিবর্তনের মতো মানবিক সংকটের মোকাবিলায়। কারণ, একটি বুলেট একটি জীবন কেড়ে নিতে পারে, কিন্তু একটি সুস্থ ও শিক্ষিত মন পারে কোটি জীবনের নিরাপত্তা দিতে। অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ বা নিরস্ত্রীকরণ কেবল কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয়, এটি মানবসভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার এক পরম শর্ত।

আমাদের মনে রাখতে হবে, শান্তি মানে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি হলো এমন এক পরিবেশ যেখানে প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে ঘুমাতে পারে, যেখানে ক্ষুধার রাজ্যে বারুদ প্রধান হয়ে ওঠে না। আর এই পরিবেশ তৈরিতে নারীদের অংশগ্রহণ আজ আর কেবল কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং তা এক অনস্বীকার্য অধিকার। শান্তির আলোচনা যখনই কেবল ড্রয়িংরুমের টেবিলে বা পুরুষতান্ত্রিক কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন তা প্রায়শই পূর্ণতা পায় না। যখনই সেই প্রক্রিয়ায় নারীদের মনস্তত্ত্ব, সংবেদনশীলতা এবং দূরদর্শিতাকে যুক্ত করা হয়, তখনই কেবল টেকসই সমাধানের পথ উন্মুক্ত হয়। ধ্বংসের বিপরীতে সৃষ্টির এই যে চিরন্তন নারী শক্তি, তাকেই আজ স্যালুট জানানোর সময়।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর