সন্তান হারানোর তীব্র যন্ত্রণা ও শূন্যতা পৃথিবীর বুকে যেকোনো মা-বাবার জন্য সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। এই চরম বিপদের মুহূর্তে ইসলাম মুমিনদের হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দিয়েছে। সেসঙ্গে, পরলোকে চলে যাওয়া সন্তানের কল্যাণে এবং নিজেদের আত্মিক শান্তির জন্য কিছু বিশেষ আমল ও করণীয়র কথা বলেছে।
নিচে এমন কিছু আমল ও বিষয়ের বিবরণ দেওয়া হলো, যা মৃত সন্তানের আত্মার মাগফিরাত এবং মা-বাবার জন্য সওয়াবের কারণ হতে পারে…
ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর ওপর সন্তুষ্টি: ‘বায়তুল হামদ’ লাভ
সন্তানকে হারানোর পর প্রথম আঘাতের মুহূর্তেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং আল্লাহর ফয়সালাকে মেনে নেওয়া সবচেয়ে বড় আমল।
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, যখন কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন, ‘তোমরা আমার বান্দার সন্তানের প্রাণ হরণ করলে?’ ফেরেশতারা বলেন, ‘হ্যাঁ।’ আল্লাহ আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘আমার বান্দা তখন কী বলল?’ ফেরেশতারা উত্তর দেন, ‘সে আপনার প্রশংসা করেছে এবং ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়েছে।’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জান্নাতে আমার এই বান্দার জন্য একটি ঘর তৈরি করো এবং তার নাম দাও ‘বায়তুল হামদ’ (প্রশংসার গৃহ)।’ (সুনানে তিরমিজি)
মা-বাবার আন্তরিক প্রার্থনা ও ক্ষমা প্রার্থনা
মারা যাওয়া সন্তানের জন্য মা-বাবার দোয়া আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত মূল্যবান। সন্তানের মাগফিরাত, কবরের শান্তি ও জান্নাতুল ফিরদাউস কামনায় নিয়মিত দোয়া করা উচিত।
নবীজি (সা.) মৃত ব্যক্তির জন্য এই দোয়াটি পড়তে শিখিয়েছেন:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَعَافِهِ وَاعْفُ عَنْهُ
অর্থ: হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন, তার ওপর দয়া করুন, তাকে নিরাপদে রাখুন এবং তার গুনাহসমূহ মার্জনা করুন। (সহিহ মুসলিম)
সন্তানের নামে সদকায়ে জারিয়া ও দান-সদকা
মৃত সন্তানের পক্ষ থেকে মা-বাবা যেকোনো কল্যাণমূলক কাজে দান-সদকা করতে পারেন, যার সওয়াব সরাসরি ওই সন্তানের আমলনামায় পৌঁছায়। হাদিস শরিফে এসেছে:
এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে জানতে চাইলেন যে, তার মা হঠাৎ মারা গেছেন এবং তিনি কোনো অসিয়ত করে যেতে পারেননি। এখন তিনি যদি মায়ের পক্ষ থেকে দান করেন, তবে কি মা এর সওয়াব পাবেন? নবীজি (সা.) উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
যেসব উপায়ে দান করা যেতে পারে…
অসহায় ও এতিমদের খাবারের ব্যবস্থা করা।
কোনো শুষ্ক বা অভাবী এলাকায় নলকূপ বা পানির ব্যবস্থা করে দেওয়া।
মসজিদ, মাদরাসা বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা করা।
পবিত্র কোরআন শরিফ বা দ্বীনি বই বিতরণ করা।
অনাদায়ী ফরজ বা মানতের ইবাদত সম্পন্ন করা
সন্তান যদি প্রাপ্তবয়স্ক (বালেগ) হওয়ার পর মারা যায় এবং তার কোনো ফরজ বা মানতের ইবাদত বাকি থাকে, তবে অভিভাবক হিসেবে মা-বাবা তা পূরণ করতে পারেন।
রোজা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কেউ যদি জিম্মায় রোজা বাকি থাকা অবস্থায় মারা যায়, তবে তার অভিভাবক যেন তার পক্ষ থেকে সিয়াম পালন করে।’ (সহিহ বুখারি)
হজ: কোনো সন্তানের ওপর হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যদি সে তা আদায় না করে মারা যায়, তবে তার রেখে যাওয়া অর্থ থেকে বা মা-বাবা নিজেদের খরচে তার পক্ষ থেকে ‘বদল হজ’ করাতে পারেন। (সহিহ বুখারি)
নাবালক শিশুর মৃত্যুতে জান্নাতের সুসংবাদ
যাদের সন্তান ছোট বা অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মারা যায়, তাদের জন্য ইসলামে বিশেষ সান্ত্বনা ও সুসংবাদ রয়েছে।
নবী করিম (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলমানের যদি তিনটি সন্তান অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় মারা যায়, তবে আল্লাহ তাআলা সন্তানদের প্রতি তাঁর বিশেষ রহমতের কারণে সেই মা-বাবাকেও জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সহিহ বুখারি)
অন্য হাদিসের বিবরণ অনুযায়ী, এই ছোট শিশুরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে তাদের মা-বাবার জন্য সুপারিশ করবে এবং মা-বাবাকে সাথে না নিয়ে জান্নাতে যেতে অস্বীকৃতি জানাবে। (সুনানে ইবনে মাজাহ)
যেসব কুসংস্কার ও নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকবেন
সন্তান হারানোর বেদনায় ভেঙে পড়ে এমন কিছু করা যাবে না যা শরিয়ত অনুমোদন করে না। যেমন:
উচ্চৈঃস্বরে বুক চাপড়ে বিলাপ করা বা ভাগ্যকে গালি দেওয়া।
কবরকে কেন্দ্র করে সিজদা, মোমবাতি জ্বালানো বা কোনো বেদাতী অনুষ্ঠান করা।
মিলাদ, চল্লিশা বা কুলখানির মতো প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও ভোজের আয়োজন করা (যা সুন্নাহসম্মত নয়)।
সন্তানের চিরবিদায় মা-বাবার জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার এই বিচ্ছেদ সাময়িক। একজন মুমিনের আসল ঠিকানা পরকাল। শোকের এই কঠিন সময়কে ধৈর্য, ইস্তেগফার ও সৎকাজের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই ইসলামের শিক্ষা।