Thursday 01 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

গোয়ালন্দে এসে থেমে থাকা চারগোলা গণপ্রস্থান

নেহাল আহমেদ
১ অক্টোবর ২০২৬ ১৫:০০

একদিন হাজার হাজার মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল। তাদের হাতে ছিল না কোনো অস্ত্র, ছিল না কোনো বিজয়ের পতাকা। ছিল শুধু ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা। আসামের চা-বাগানের দীর্ঘ শ্রমজীবন পেছনে ফেলে তারা বলেছিল— ফিরতে হবে নিজেদের ‘মুলুকে’।

১৯২১ সালের সেই যাত্রা ইতিহাসে ‘চারগোলা গণপ্রস্থান’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যেন আজও অন্ধকারে— গোয়ালন্দ।

আসামের চা-বাগান থেকে বেরিয়ে চাঁদপুর হয়ে যে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ গোয়ালন্দে পৌঁছেছিল, তাদের পরবর্তী পরিণতির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস কোথায়? কতজন গোয়ালন্দ থেকে রেলে উঠেছিলেন? কতজন নদীপথে বা পায়ে হেঁটে এগিয়েছিলেন? কতজন অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন? কতজন শেষ পর্যন্ত নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পেরেছিলেন?

বিজ্ঞাপন

এক শতাব্দী পরও এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আমাদের হাতে নেই।

যে যাত্রার শুরু আসামের চা-বাগানে

উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে আসামের চা-বাগানগুলোতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করতেন। তাদের বড় অংশই স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বাইরে থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়ে যাওয়া শ্রমিকদের বংশধর।

চা-বাগানের শ্রমব্যবস্থা ছিল কঠোর নিয়ন্ত্রণনির্ভর। মজুরি, কাজের পরিবেশ, চলাফেরার স্বাধীনতা এবং বাগান কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমছিল। ১৯২১ সালে সেই অসন্তোষ বিস্ফোরিত হয়।

চারগোলা ও লংগাই উপত্যকার চা-বাগানগুলো থেকে হাজার হাজার শ্রমিক কাজ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। তাদের লক্ষ্য ছিল বাড়ি ফিরে যাওয়া। মে মাসে তাদের একটি বড় অংশ করিমগঞ্জ হয়ে চাঁদপুরের দিকে আসে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপস্থাপিত সরকারি প্রতিবেদনে এই শ্রমিকদের সংখ্যা কয়েক হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ছিল কেবল একটি শ্রমিক ধর্মঘট নয়। এটি ছিল মানুষের নিজের জীবনের ওপর নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষারও একটি প্রকাশ।

চাঁদপুরে এসে আটকে গেল ঘরে ফেরার পথ

চাঁদপুর তখন ছিল পূর্ববঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী ও রেল যোগাযোগকেন্দ্র। শ্রমিকদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল গোয়ালন্দ। কিন্তু চাঁদপুরে পৌঁছে তাদের সামনে খুলে গেল আরেক সংকট।

১৯ মে নাগাদ বিপুলসংখ্যক শ্রমিক চাঁদপুরে জড়ো হন। সরকারি বিবরণে প্রায় ৩ হাজার শ্রমিকের উপস্থিতির কথা উঠে আসে। তাদের অনেকেই স্টেশন ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাদের প্রয়োজন ছিল শুধু একটি জিনিস— পরিবহন। গন্তব্য গোয়ালন্দ।

১৯ মে রাতে প্রায় ৪০০ শ্রমিক গোয়ালন্দগামী একটি মেইল স্টিমারে ওঠার চেষ্টা করেন। সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিস্থিতির কারণে স্টিমারটি ঘাট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শ্রমিকদের নদীতে পড়ে মৃত্যুর মতো কোনো ঘটনার কথাও সরকারি প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন বর্ণনা থাকলেও, মৃত্যুর নির্দিষ্ট সংখ্যা প্রমাণিত নয়।

কিন্তু ঘটনাটি একটি বিষয় পরিষ্কার করে—গোয়ালন্দ তখন তাদের কাছে ছিল ঘরে ফেরার দরজা।

গোয়ালন্দে পৌঁছেছিল হাজার হাজার শ্রমিক

ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ৩ জুন ১৯২১ উপস্থাপিত সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৫০০ শ্রমিককে গোয়ালন্দে পাঠানো হয়েছিল। পরে আরও প্রায় ৯৫০ জন সেখানে পৌঁছান। ২৭ জুনের আরেক সরকারি প্রতিবেদনে চাঁদপুর থেকে গোয়ালন্দে পাঠানো কয়েকটি দলের হিসাব পাওয়া যায়। সেখানে প্রায় ১,০০০ শ্রমিক ও শিশু, ১৬ মে ৪৫০ জন, এবং ১৭ মে আরও ৯৩৭ জনকে গোয়ালন্দের দিকে পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়।

এই সংখ্যাগুলোকে সরলভাবে যোগ করে মোট শ্রমিকের সংখ্যা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কারণ এগুলো বিভিন্ন সময়ে পাঠানো পরিবহন-দলের হিসাব এবং একই ব্যক্তির একাধিক নথিতে থাকার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার— গোয়ালন্দ ছিল চারগোলা গণপ্রস্থানের একটি বড় ট্রানজিট কেন্দ্র।

তারপর?

এই ‘তারপর’ শব্দটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। সরকারি নথি আমাদের বলে—শ্রমিকরা গোয়ালন্দে পৌঁছেছিল।

কিন্তু এরপর?
কেউ কি রেলে উঠেছিল?
কেউ কি পায়ে হেঁটে নিজ গ্রামের দিকে রওনা হয়েছিল?
কেউ কি স্থানীয় মানুষের সহায়তা পেয়েছিল?
কেউ কি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল?
কেউ কি পথে মারা গিয়েছিল?
কেউ কি শেষ পর্যন্ত আসামের চা-বাগানে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল?

… নথির ধারাবাহিকতা এখানে অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে আসে।

৩ জুনের সরকারি প্রতিবেদনে এমনও বলা হয়, গোয়ালন্দে পৌঁছানো একদল শ্রমিক জানতে পারে যে সরকার তাদের নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যয় বহন করবে না। তাদের কেউ কেউ নৈহাটির দিকে পায়ে হেঁটে রওনা হন এবং স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে কেউ কেউ রেলে যাত্রা করেন।

অর্থাৎ গোয়ালন্দ তাদের জন্য শেষ গন্তব্য ছিল না; ছিল আরেকটি যাত্রার শুরু।

ধর্মঘট যখন পথ বন্ধ করে দিল

এর মধ্যেই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। চাঁদপুরে রেল ধর্মঘট শুরু হয় ২৪ মে। কয়েক দিনের মধ্যে স্টিমার ধর্মঘটও শুরু হয়। নদীপথের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়ে, যার মধ্যে গোয়ালন্দও ছিল। ফলে যারা ঘরে ফেরার জন্য হাজার মাইলের মতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন, তাদের সামনে আবারও বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগের পথ।

এদিকে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি প্রতিবেদনে চাঁদপুরে কলেরায় আক্রান্ত শ্রমিক ও রেলকর্মীর উল্লেখ রয়েছে। একই প্রতিবেদনে মে মাসের শেষভাগে রোগে মৃত্যুর একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যার কথাও বলা হয়েছে। তবে ওই মৃত্যুর সবাই যে চা-শ্রমিক ছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসকে আবেগ দিয়ে বলা যায়, কিন্তু প্রমাণের জায়গায় অনুমান বসানো যায় না।

চাঁদপুরের গোর্খা বাহিনী এবং বিতর্কিত অধ্যায়

শ্রমিকদের চাঁদপুর স্টেশন থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাটিও ইতিহাসে বিতর্কিত।

২০ মে সেখানে পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত রাইফেলসের সদস্যদের পাঠানো হয়। সরকারি প্রতিবেদনে শ্রমিকদের সরিয়ে দেওয়ার সময় সীমিত শক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয় এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়।

অন্যদিকে শ্রমিকপক্ষীয় ও পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণে ঘটনাটিকে অত্যন্ত কঠোর দমন হিসেবে দেখা হয়েছে। এই কারণে ঘটনাটিকে একক কোনো সরকারি বয়ানে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন পক্ষের নথি, সংবাদপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ ও পরবর্তী গবেষণা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সি. এফ. অ্যান্ড্রুজের উদ্যোগ

এই সংকটের মধ্যে ব্রিটিশ ধর্মযাজক ও মানবতাবাদী সি. এফ. অ্যান্ড্রুজ শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। শ্রমিকদের খাবার, চিকিৎসা এবং ঘরে ফেরানোর জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়। তাদের পরিবহনের ব্যবস্থাও করার চেষ্টা চলে। এই মানবিক প্রচেষ্টার বিবরণ পরবর্তী স্মৃতিচর্চা ও গবেষণায় পাওয়া যায়।

কিন্তু একটি বিষয় লক্ষণীয়— শ্রমিকদের যাত্রাপথের প্রতিটি ধাপের ব্যক্তিগত হিসাব আমাদের হাতে নেই।

ইতিহাসে তখন মানুষের নামের চেয়ে সংখ্যা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল…

৫০০, ৯৫০, ১,০০০, ৪৫০, ৯৩৭।

কিন্তু এই সংখ্যার প্রত্যেকটির পেছনে ছিল একজন মানুষ। একটি পরিবার। একটি গ্রাম। একটি ঘর।

গোয়ালন্দের ইতিহাসে যে প্রশ্নটি রয়ে গেছে

গোয়ালন্দকে আমরা বহুদিন ধরে দেখেছি রেল, পদ্মা, স্টিমার ও বাণিজ্যের ইতিহাস দিয়ে। কিন্তু গোয়ালন্দের ইতিহাসের আরেকটি মুখ আছে— মানুষের যাত্রার ইতিহাস। এই ঘাট দিয়ে কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ গেছে— তার সব হিসাব হয়তো কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। কিন্তু ১৯২১ সালের চারগোলা গণপ্রস্থানকে ঘিরে গোয়ালন্দের ভূমিকা এখন নতুন করে অনুসন্ধান করা সম্ভব।

পুরোনো রেলওয়ে নথি, স্টেশন ডায়েরি, যাত্রী নিবন্ধন, স্টিমার কোম্পানির হিসাব, জেলা প্রশাসনের ফাইল, পুলিশ রিপোর্ট, সমকালীন সংবাদপত্র এবং স্থানীয় পরিবারের পুরোনো কাগজপত্র— সবগুলো যদি একসঙ্গে অনুসন্ধান করা যায়, তাহলে হয়তো এই ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া অংশ উদ্ধার হতে পারে।

এমনকি গোয়ালন্দ ও আশপাশের এলাকায় কোনো পরিবারে যদি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কোনো অচেনা পূর্বপুরুষের ‘আসাম থেকে ফিরে আসার’ গল্প থেকে থাকে, সেটিও হতে পারে গবেষণার সূত্র।

এক শতাব্দী পরও যে যাত্রা শেষ হয়নি

চারগোলা গণপ্রস্থানকে শুধু আসামের চা-শ্রমিকদের আন্দোলন হিসেবে দেখলে গোয়ালন্দের ভূমিকা আড়ালে থেকে যায়। কারণ তাদের ঘরে ফেরার পথে গোয়ালন্দ ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

চাঁদপুরের ঘাট থেকে যে মানুষগুলো পদ্মার দিকে তাকিয়ে নিজেদের ঘরের কথা ভেবেছিল, তাদের অনেকেই হয়তো গোয়ালন্দে পা রেখেছিল।

কেউ রেলে উঠেছিল। কেউ হয়তো পায়ে হেঁটেছিল। কেউ হয়তো অসুস্থ হয়েছিল। কেউ হয়তো আর কোনোদিন নিজের ঘরে পৌঁছাতে পারেনি… আমরা জানি না।

আর ইতিহাসের এই ‘জানি না’-টিই গবেষণার সবচেয়ে বড় জায়গা।

এক শতাব্দী পরে তাই প্রশ্নটি আবার করা দরকার—

১৯২১ সালে আসামের চা-বাগান থেকে ঘরে ফেরার পথে গোয়ালন্দে আসা সেই মানুষগুলোর শেষ পরিণতি কী হয়েছিল?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুধু অতীতকে জানার চেষ্টা নয়। এটি গোয়ালন্দের নিজের ইতিহাসকে পূর্ণ করারও চেষ্টা। হয়তো কোনো পুরোনো রেলখাতায় এখনও লেখা আছে তাদের যাত্রার শেষ হিসাব। হয়তো কোনো বিস্মৃত স্টিমার তালিকায় আছে তাদের নাম। হয়তো কোনো গ্রামবাংলার পুরোনো পরিবারের স্মৃতিতে এখনও বেঁচে আছে সেই মানুষগুলোর গল্প।

চারগোলা গণপ্রস্থান তাই শুধু একটি আন্দোলনের ইতিহাস নয়— এটি মানুষের ঘরে ফেরার ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় লেখা হয়েছিল গোয়ালন্দের মাটি ও পদ্মার জলে।

লেখক: কবি, লেখক ও গবেষক