খেলার মাঠে যখন কোনো দল বা খেলোয়াড় ট্রফি উঁচিয়ে ধরে, তখন চারপাশে থাকে হাজার হাজার মানুষের করতালির গর্জন আর আলোর ঝলকানি। কিন্তু এই জয়ের নেপথ্যে যিনি ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ঘাম মোছেন, ড্রেসিংরুমে বসে চকবোর্ডে একের পর এক কৌশল আঁকেন আর শিষ বাজিয়ে শিষ্যদের অনুপ্রাণিত করেন, সেই মানুষটির কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। ক্রীড়াজগতের এই নেপথ্য নায়কদের সম্মান জানাতেই প্রতি বছর পালন করা হয় ‘ন্যাশনাল কোচেস ডে’ বা জাতীয় কোচ দিবস।
খেলাধুলার দুনিয়ায় কোচের গুরুত্ব অসীম হলেও তাদের নিয়ে মজার অভিজ্ঞতার অভাব নেই। একজন কোচের জীবন আসলে অদ্ভুত এক রোলারকোস্টার রাইডের মতো। তারা যখন দলকে জেতান, তখন সব আলো কেড়ে নেয় খেলোয়াড়দের পারফর্ম্যান্স। কিন্তু দল হেরে গেলেই সব দোষ এসে পড়ে কোচের ঘাড়ে। মাঠে খেলোয়াড় ভুল করলেও গ্যালারির হাজার হাজার দর্শকের নজর থাকে ডাগআউটের দিকে যেখানে কোচ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন অথবা রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে নিজের ক্যাপটা ছুড়ে মারছেন। আবার ম্যাচের মাঝপথে দূর থেকে তীব্র গলায় চিৎকার করে অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গিতে খেলোয়াড়দের সংকেত দেওয়ার দৃশ্য যেকোনো মানুষকে বিনোদিত করতে বাধ্য।
কোচদের এই অবদান ও আত্মত্যাগকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে ১৯৭২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম জাতীয়ভাবে এই দিবসটির সূচনা ঘটে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন আনুষ্ঠানিকভাবে ৬ অক্টোবরকে ‘ন্যাশনাল কোচেস ডে’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল শুধু পেশাদার খেলাধুলার কোচ নয়, বরং স্কুল, কলেজ এবং স্থানীয় কাইয়ুম-পাড়ার ক্লাবগুলোতে তরুণদের গড়ে তোলার পেছনে যেসব কোচ দিনরাত পরিশ্রম করেন, তাদের সম্মান জানানো।
একজন ভালো কোচ কেবল মাঠের কৌশল শেখান না, তিনি হয়ে ওঠেন একজন অভিভাবক, মেন্টর এবং পরম বন্ধু। খেলোয়াড় যখন ফর্ম হারিয়ে বিষণ্ণতায় ভোগেন, তখন এই কোচই তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, “তুমি পারবে।” খেলার কৌশল বোঝানোর পাশাপাশি জীবনের নানা কঠিন পরিস্থিতিতে কীভাবে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়, সেই জীবনপাঠও শিষ্যদের শিখিয়ে দেন তারা। অনেক সময় একজন কড়া কোচের বকুনি শুনে মনে হতে পারে তিনি ভীষণ নিষ্ঠুর, কিন্তু দিনশেষে শিষ্যের সাফল্য দেখে যার চোখে সবচেয়ে আগে আনন্দের জল আসে, তিনি সেই কোচই।
১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন যখন প্রথম প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন, তখন উদযাপনটা মূলত ছিল স্থানীয় স্কুল-কলেজ, প্রথাগত রেডিও-পত্রিকা বা ছোটখাটো টিম গেট-টুগেদারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে প্রযুক্তির বিস্তার এবং স্পোর্টস কালচারের উন্নতির সাথে সাথে এই দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালনের ধরণে আধুনিকতা এসেছে।
বর্তমানে ক্লাব, জাতীয় দল এবং সাধারণ অ্যাথলেটরা ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা এক্স-এ (সাবেক টুইটার) তাদের প্রিয় কোচের সাথে ছবি, ভিডিও ক্লিপ এবং পুরোনো স্মৃতি শেয়ার করে শ্রদ্ধা জানান। ডিজিটাল হ্যাশট্যাগ #NationalCoachesDay ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক স্তরে কোচদের কাজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
আধুনিক বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ ৬ অক্টোবরের ম্যাচগুলোতে খেলা শুরু হওয়ার আগে কোচের জন্য বিশেষ ট্রিব্যুট ভিডিও দেখায়, স্মারক উপহার দেয় কিংবা ড্রেসিংরুমে ভিডিও সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করে।
সত্তরের দশকে এটি কেবল ফুটবল, বাস্কেটবল বা অ্যাথলেটিকসের মতো গতানুগতিক খেলার কোচদের কেন্দ্র করে চালু হয়েছিল। তবে বর্তমান যুগে স্পোর্টস কোচের পাশাপাশি লাইফ কোচ, ই-স্পোর্টস (গেমিং) কোচ, জিম ইনস্ট্রাক্টর, ফিটনেস মেন্টর এবং কর্পোরেট এআই/এক্সিকিউটিভ কোচদের অবদানও এই দিনে সমানভাবে স্মরণ করা হয়।
পুরোনো শিক্ষার্থীরা বা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটরা এই দিনে মেসেজ, কল বা ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বছরজুড়ে অন্তরালে থাকা তাদের ক্যারিয়ার গড়া প্রথম কোচকে স্মরণ করেন এবং সরাসরি ধন্যবাদ জানান।
আজকের দিনে আপনার জীবনের কোনো না কোনো সময় ছায়া হয়ে থাকা সেই প্রিয় কোচকে স্মরণ করতে পারেন। তিনি হতে পারেন আপনার শৈশবের ক্রিকেট কোচ, স্কুলের ফুটবল পিই টিচার, জিম ইনস্ট্রাক্টর কিংবা জীবনের কঠিন পথ দেখিয়ে দেওয়া কোনো মেন্টর। একটি ছোট ‘ধন্যবাদ’ বার্তা কিংবা এক কাপ চায়ের নিমন্ত্রণ দিয়েই মাঠের পেছনের এই আসল নায়কদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা সম্ভব।