বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনী, ক্রমান্বয়ে একটি ঔপনিবেশিক ও দমনমূলক চরিত্রের বাইরে গিয়ে জনমুখী ও গণতান্ত্রিক রূপ লাভের চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তনের পথ মসৃণ ছিল না; বরং স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে, বিশেষত ১৯৭৫, স্বৈরশাসনের অবসান এবং ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধারে আপোষহীন নেত্রী ও ৩বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিসংবাদিত অধ্যায়। আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনীর যে বিনির্মাণ (Reconstruction) ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা কেবল একটি বাহিনীর কাঠামোগত পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি জাতির আইনশৃঙ্খলা কাঠামোর মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাগত রূপান্তরের সূচনা।
বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পূর্বে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল চরম অস্থিতিশীল। স্বৈরশাসনের আমলে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়েছিল; তারা রাজনৈতিক প্রভুর আনুগত্য করতে বাধ্য হতো। পুলিশের ভাবমূর্তি জনগণের কাছে ভীতিকর ও অবিশ্বাস্য হয়ে উঠেছিল। এই অবস্থা থেকে পুলিশ বাহিনীকে বের করে আনা এবং তাদের একটি আধুনিক, পেশাদার ও মানবাধিকার-সচেতন বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার যে মহাপরিকল্পনা বেগম খালেদা জিয়া গ্রহণ করেন, তার বিস্তারিত আলোচনাই এই নিবন্ধের মূল বিষয়বস্তু।
প্রথম অধ্যায়: ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন পুলিশ বাহিনীর অবস্থা ছিল শোচনীয়। ১৯৭৪-৭৫, ১৯৮২-৯০ বেসামরিক ও সামরিক স্বৈরশাসনের দীর্ঘ বছরের শাসনামলে পুলিশ বাহিনী চরমভাবে রাজনীতিকরণের শিকার হয়। স্বৈরশাসকেরা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য পুলিশকে ব্যবহার করেছিল।
পুলিশের কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামাদি ছিল সেকেলে ও অপর্যাপ্ত। পুলিশ লাইন ও থানাগুলোর অবকাঠামোগত অবস্থা ছিল ভঙ্গুর। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে শৃঙ্খলাবোধ ও পেশাগত স্বাধীনতা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছিল। স্বৈরশাসনের আমলে পুলিশের ট্রান্সফার, পদোন্নতি ও পুনর্বহাল হতো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাব খাটানোর স্বার্থে। এছাড়া, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশ বাহিনীকে সরকারের হয়ে জনতার ওপর দমন-নিপীড়ন চালাতে বাধ্য করা হয়েছিল, যা পুলিশের জনপ্রিয়তা ও সামাজিক মর্যাদাকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং তাদের মধ্যে পেশাগত মর্যাদাবোধ জাগ্রত করা ছাড়া কোনো গতি নেই।
দ্বিতীয় অধ্যায়: ১৯৯১-১৯৯৬: পুলিশ বিনির্মাণের প্রাথমিক পদক্ষেপ ও গণতান্ত্রিক রূপরেখা ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় আসার পর আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার প্রথম উদ্যোগ নেন। তার সরকার পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও পারিশ্রমিকহীন যে অবস্থা বিরাজ করছিল, তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তন আনেন…
১. রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্তি: তিনি পুলিশ প্রশাসনের বদলি, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক ছাড়পত্রের প্রথা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। পুলিশ সুপার ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার নৈতিক সাহস জোগান।
২. অবকাঠামো উন্নয়ন: ১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদে থানা ভবন ও পুলিশ লাইনের পুনঃনির্মাণ করা হয়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে থানা পরিদর্শন বৃদ্ধি পায় এবং থানা ভবনগুলোকে জনমুখী করে তোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ৩. মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনরুদ্ধার: স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে পুলিশ বাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধাদের ও তাদের সন্তানদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা পুনরায় কার্যকর করা হয়, যা বাহিনীর মধ্যে দেশপ্রেম ও মনোবল বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
তৃতীয় অধ্যায়: তৃতীয় মেয়াদ (২০০১-২০০৬) বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। এই সময়ে পুলিশ বাহিনীর পুরোপুরি বিনির্মাণ ও আধুনিকায়নের এক বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। আপোষহীন নেত্রী হিসেবে তার সবচেয়ে বড় অবদান ছিল পুলিশের ভিতরে একটি নতুন কাঠামো ও আইনি কাঠামোর সংযোজন।
৩.১. বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ: বাংলাদেশের সংবিধানের ২২ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার যে নির্দেশ ছিল, তা বাস্তবায়নে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ২০০৭ সালে এটি কার্যকর হলেও, এর প্রশাসনিক ও আইনি নীতিমালা ও মাস্টারপ্ল্যান তৈরি হয় ২০০১-২০০৬ মেয়াদে। এর ফলে পুলিশের তদন্ত কার্যক্রম এবং প্রসিকিউশন বা আদালতে মামলা পরিচালনার কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। পুলিশের তদন্ত শাখা (Detective Branch) এবং প্রসিকিউশন শাখার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি পায় এবং বিচারিক কাজে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের একচ্ছত্র আধিপত্য কমিয়ে বিচারিক বিচারকদের ক্ষমতা প্রবলতর করা হয়।
৩.২. র্যাব (RAB) গঠন ও বিশেষায়িত ইউনিটের জন্ম: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থী অপরাধ দমনের লক্ষ্যে ২০০৪ সালে বেগম খালেদা জিয়ার সরকার ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (RAB) গঠন করে। এটি পুলিশের চেইন অফ কমান্ডের অধীনে একটি কৌশলগত বাহিনী হিসেবে গঠিত হলেও এর কার্যক্রম ছিল পুলিশের বিনির্মাণের একটি নতুন মাত্রা। র্যাব গঠনের মাধ্যমে সাধারণ পুলিশের ওপর থেকে চাপ কমে এবং গোয়েন্দা ও তদন্তমূলক কাজে বিশেষায়িত ইউনিট কাজ শুরু করে। এছাড়া সাইবার ক্রাইম, নারকোটিক্স এবং অর্গানাইজড ক্রাইম দমনে বিশেষ কমিটি ও ব্যুরো গঠনের প্রাথমিক কাজ এই আমলেই সম্পন্ন হয়।
৩.৩. পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (PBI) প্রতিষ্ঠার ভিত্তি: পরবর্তীতে ২০১৯ সালে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (PBI) আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করলেও, এর ধারণাগত ও কাঠামোগত ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে। সাধারণ থানা পুলিশের চাপ কমিয়ে মামলার তদন্ত কাজ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তদন্ত কাঠামোকে আলাদা করার যে চিন্তাভাবনা তিনি করেছিলেন, তারই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীকালে পিবিআই গঠিত হয়।
৩.৪. পুলিশের কল্যাণ ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি: বাহিনীর মনোবল ধরে রাখতে বেগম খালেদা জিয়া পুলিশের কল্যাণে ব্যাপক অর্থ বরাদ্দ করেন। তার শাসনামলে-
পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘ব্যারাক’ নির্মাণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
পুলিশ লাইন ও কলোনিতে আবাসন সংকট মেটাতে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু হয়।
সাধারণ কনস্টেবল থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা ও ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধি করা হয়।
পুলিশের পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য বীমা ও চিকিৎসা সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়।
৩.৫. নারীদের পুলিশে সম্পৃক্তকরণ: বেগম খালেদা জিয়া, যিনি নিজে একজন নারী নেত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীদের একজন। তিনি পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে জোর দেন। তার শাসনামলেই পুলিশে নারী কোটা সংরক্ষণ ও নারীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ব্যারাক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশে নারীদের যে শক্তিশালী অবস্থান, তার পথিকৃৎ হিসেবে তাকেই বিবেচনা করা যায়।
চতুর্থ অধ্যায়: প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন পুলিশ বিনির্মাণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন। বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, আধুনিক যুগের সুসংগঠিত অপরাধীদের মোকাবিলা করতে হলে কেবল লাঠিসোঁটা আর লেগান টুপি পরে চলবে না, প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির।
আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ: তার আমলে তৎকালীন পুলিশ একাডেমি, সারদা ও পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি)-তে প্রশিক্ষণ কারিকুলামে আধুনিকায়ন আনা হয়। পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি করা হয়, বিশেষ করে এফবিআই (FBI), স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও আন্তর্জাতিক পুলিশ একাডেমিগুলোতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়।
যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি: তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। থানা পর্যায়ে কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পুলিশের তদন্ত কাজে ফরেনসিক সায়েন্স ও ডিএনএ টেস্টিংয়ের ব্যবহার শুরুর প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।
পঞ্চম অধ্যায়: জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ বাংলাদেশ পুলিশকে আন্তর্জাতিক মানের বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দানে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান অপরিসীম। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) পুলিশ সদস্য পাঠানোর উদ্যোগ আগে থেকেই থাকলেও, তার শাসনামলে এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ করা হয়। শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা আন্তর্জাতিক পরিবেশে কাজ করার সুযোগ পায়, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা, ভাষাগত যোগাযোগ ও বিশ্বব্যাপী সম্মান বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সেই সময়েই পুলিশকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দাঁড় করানোর যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে।
ষষ্ঠ অধ্যায়: আইন ও মানবাধিকার সচেতনতা। স্বৈরশাসনের আমলে পুলিশের ওপর যে অভিযোগ ছিল তা হলো, তারা আইনকে তুচ্ছ করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। বেগম খালেদা জিয়া পুলিশকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দেন। তার সময়ে পুলিশের মানবাধিকার বিষয়ক প্রশিক্ষণ চালু হয়। এছাড়া, অপরাধীদের অপরাধ প্রমাণের জন্য নির্যাতনের বদলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়। থানা পর্যায়ে মানবাধিকার চর্চা ও জনগণের অভিযোগ দ্রুত তদন্তের জন্য একটি কমপ্লেয়েন্ট সেল চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সপ্তম অধ্যায়: বেগম খালেদা জিয়া পুলিশ বাহিনীর বিনির্মাণে যে কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা মসৃণভাবে সম্পন্ন হয়নি। তার সরকারকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ১. রাজনৈতিক বিরোধিতা ও অস্থিতিশীলতা: তার শাসনামলে বিরোধী দলগুলো হরতাল-অবরোধের নামে ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি পালন, উগ্রবাদীরা নারকীয় তান্ডব করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করেছিল, যা পুলিশকে কঠোর হতে বাধ্য করেছিল। ২. বাজেট সংকট: একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পুলিশের আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল বাজেট অনুমোদন করা সবসময় সম্ভব ছিল না। ৩. দুর্নীতি: সমাজের কিছু অংশে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতি পুলিশের ভেতরেও সংক্রমিত ছিল। তবে আপোষহীন নেত্রী হিসেবে তিনি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অষ্টম অধ্যায়: বর্তমান প্রেক্ষাপটে তার অবদানের মূল্যায়ন করলে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ পুলিশ একটি আধুনিক ও বৃহত্তর বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব, সাইবার ক্রাইম ইউনিট এর মতো পুলিশ আধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। এই সব কিছুর শেকড় খুঁজে পাওয়া যায় বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে গৃহীত নীতিমালার মধ্যে। তিনি পুলিশ বাহিনীকে কেবল একটি চাকরি হিসেবে নয়, বরং জাতির একটি সম্মানজনক ও গৌরবময় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। তার আপোষহীন নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো, তিনি পুলিশকে ক্ষমতার মোহ থেকে মুক্ত করে পেশাগত স্বাধীনতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন পুলিশ যেন কোনো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার না হয়ে স্বাধীনভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করে।
নবম অধ্যায়: বেগম খালেদা জিয়ার পুলিশ বিনির্মাণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিক হলো পুলিশকে জনগণের কাছাকাছি তথা জনবান্ধব পুলিশ করে তোলা। স্বৈরশাসনের আমলে পুলিশ ছিল একটি ভীতিকর বাহিনী, যাদের দেখলে সাধারণ মানুষ মনে মনে ভয় পেত। বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসার পর পুলিশের এই ‘শাসক’ ভাবমূর্তি বদলে ‘সেবক’ ভাবমূর্তি তৈরির নীতিগত পরিবর্তন আনেন।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি এবং ২০০১-২০০৬ সালের শাসনামলে তিনি ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ বা স্থানীয় পর্যায়ের পুলিশিংয়ের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার নির্দেশ দেন। এর মূল দর্শন ছিল—পুলিশ যেন থানার চার দেয়ালের ভেতর আটকে না থেকে সমাজের মানুষের সাথে মিশে অপরাধ প্রতিরোধ করে। এ লক্ষ্যে…
উন্মুক্ত থানা পরিদর্শন: থানায় সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়। থানা ভবনের সামনের অংশে অভিযোগ দানের জন্য আলাদা ডেস্ক স্থাপন করা হয়।
স্থানীয় সরকারের সাথে সমন্বয়: ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার চেয়ারম্যানদের সাথে পুলিশের সমন্বয় বাড়ানো হয়, যাতে স্থানীয় বিরোধগুলো আদালতে যাওয়ার আগেই সালিশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায়।
পুলিশ-জনসম্পর্ক উন্নয়ন: পুলিশের আচরণ কেমন হবে, তা নির্ধারণে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সাথে যৌথ কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
দশম অধ্যায়: বিশেষায়িত ইউনিট ও র্যাব (RAB) গঠন—একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ- বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ইতিহাসে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ একটি মাইলফলক। আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার সেদিন ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন’ (RAB) নামে একটি বিশেষায়িত কৌশলগত বাহিনী গঠন করে। এটি কেবল একটি নতুন বাহিনী গঠন ছিল না, বরং এটি ছিল বাংলাদেশ পুলিশের কার্যক্রমে এক মৌলিক বিনির্মাণ।
র্যাব গঠনের প্রেক্ষাপট
২০০১ সালে দেশে চরম আইনশৃঙ্খলা অবনতি লক্ষ করা যায়। পূর্বের আমলের পেশাদার খুনিরা যেন দেশজুড়ে ত্রাস ছড়িয়ে রেখেছিল। সাধারণ পুলিশের পোশাক ও পদ্ধতি দিয়ে এই দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছিল না। পুলিশের মধ্যে মনোবল ভেঙে পড়ছিল। বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পারেন, সাধারণ থানা-পুলিশের চেইন অব কমান্ড দিয়ে চরম ধরনের অপরাধ দমন করা যাবে না; প্রয়োজন একটি দ্রুত, কৌশলগত ও সুসজ্জিত বাহিনীর।
র্যাবের কাঠামোগত বিনির্মাণ: র্যাব গঠিত হয় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে। এর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দেশের সেরা পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। র্যাবের ইউনিফর্ম, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম ছিল আন্তর্জাতিক মানের। র্যাব গঠনের পর পেশাদার খুনিরা যেন রাতারাতি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তা বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীন নেতৃত্বেরই প্রমাণ।
কমিউনিটি ও ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চের সমন্বয়: র্যাব যখন দৃশ্যমান অপরাধ দমন করতো, ঠিক তখনই ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চকে (DB) আধুনিকায়নের মাধ্যমে গোপন অপরাধ তদন্তের কাজে লাগানো হয়। পূর্বে DB শুধু ঢাকা বা বড় শহরগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে DB-র সমতুল্য বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট গঠনের নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
পুলিশ কল্যাণ ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন (Police Welfare)
বাহিনীর বিনির্মাণ তখনই সম্পন্ন হয়, যখন সেই বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের নিরাপদ ও সম্মানিত ভাবে। বেগম খালেদা জিয়া পুলিশের কল্যাণে যে বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ বাজেট এবং প্রকল্প গ্রহণ করেছিলেন, তা পূর্ববর্তী যেকোনো সরকারের চেয়ে ছিল অনেক বেশি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, একজন পুলিশ সদস্য যদি তার পরিবারের নিরাপত্তা ও আশ্রয় নিয়ে চিন্তিত থাকে, তবে সে কখনোই পেশাগত দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করতে পারবে না।
পুলিশ কল্যাণ (Police Welfare) ও আবাসন ও ব্যারাক নির্মাণ: তার শাসনামলে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিল বৃদ্ধি করা হয়। যে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালনকালে আহত বা নিহত হতেন, তাদের পরিবারকে আর্থিক অনুদান প্রদানের জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো তৈরি করা হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ পুলিশ সদস্যই ব্যারাকে বা পুলিশ লাইনে থাকেন। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে সারাদেশে অবহেলিত পুলিশ লাইনগুলোর সংস্কার করা হয়। বহুতল বাসস্থান নির্মাণের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের আবাসন সংকট মেটানোর যে প্রক্রিয়া শুরু হয়, তা বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা করে তোলে।
চিকিৎসা ও শিক্ষা সুবিধা: বেগম খালেদা জিয়া পুলিশের সন্তানদের শিক্ষার জন্য বিশেষ স্কুল ও কলেজ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা পুলিশ লাইনস স্কুল এবং কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জেলা পর্যায়ে পুলিশ লাইনস স্কুলগুলোর আধুনিকায়ন তার আমলেই শুরু হয়। পাশাপাশি পুলিশ হাসপাতালগুলোর সরঞ্জাম ও চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়েও জোর দেওয়া হয়।
নারী পুলিশ বাহিনীর প্রসার ও মূলধারায় সম্পৃক্তকরণঃ বাংলাদেশের সংবিধানে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হলেও, স্বাধীনতার পর দীর্ঘকাল পুলিশ বাহিনীতে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল নগণ্য। মুসলিম বিশ্বের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন যে, একটি বৃহত্তর ও সামঞ্জস্যপূর্ণ সমাজ গড়তে হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীদের সম্পৃক্ত করা অপরিহার্য। তার শাসনামলে পুলিশে নারী কোটা সংরক্ষণ ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়। পাশাপাশি নারীদের জন্য আলাদা কোয়াটার ও ব্যারাক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রশিক্ষণ ও পেশাগত দক্ষতা: নারী পুলিশদের প্রশিক্ষণের জন্য বিশেষায়িত স্কুল এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের উন্নয়ন করা হয়। তিনি দেখান যে, নারী পুলিশ কেবল সার্চ বা মহিলা অপরাধীদের কন্ট্রোলের কাজেই নয়, বরং গোয়েন্দা ও তদন্ত কাজেও নারীরা পুরুষের সমান বা তার চেয়ে বেশি দক্ষতার পরিচয় দিতে পারে। তার আমলেই নারী পুলিশদের ঊর্ধ্বতন পদে পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি করা হয়।
জাতিসংঘ মিশনে নারী পুলিশ: বাংলাদেশ পুলিশকে একটি পেশাদার ও আন্তর্জাতিক মানের বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া এক শ্রেষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৮৯ সালে প্রথম বাংলাদেশ পুলিশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে যেতে শুরু করলেও, এই বাহিনীকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে দাঁড় করানোর যে বিপুল কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন ছিল, তা বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই কার্যকর হয়। তার শাসনামলে আন্তর্জাতিক পুলিশ মিশনে যোগদানের জন্য পুলিশ সদস্যদের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ পুলিশের কন্টিনজেন্ট সিয়েরা লিওন, কসোভো, পূর্ব তিমুর ও হাইতিতে সফলভাবে কাজ করে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। এই মিশনগুলো থেকে ফিরে আসা পুলিশ সদস্যরা বাংলাদেশে এসে যে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পুলিশিংয়ের ধ্যানধারণা প্রয়োগ করতে শুরু করে, তা বাহিনীর বিনির্মাণে এক অব্যাহত স্রোত হিসেবে কাজ করে।
বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই বাংলাদেশের নারী পুলিশদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বাংলাদেশের নারী পুলিশরা যে সম্মান কুড়িয়েছেন, তার নেপথ্যে রয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার সেই দূরদর্শী নীতি।
ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর সূচনাঃ বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ এবং অপরাধ প্রমাণের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বেগম খালেদা জিয়ার পুলিশ বিনির্মাণের আরেকটি মূল স্তম্ভ। পূর্বে পুলিশের তদন্তে সাক্ষীর স্টেটমেন্ট এবং স্বীকারোক্তির (যা অনেক সময় জোরপূর্বক আদায় করা হতো) উপর নির্ভর করা হতো। বেগম খালেদা জিয়া তদন্ত প্রক্রিয়াকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর নীতি গ্রহণ করেন। তার শাসনামলে ঢাকার ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরির কাঠামোগত উন্নয়ন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ডিএনএ (DNA) টেস্টিং, ব্যালিস্টিক টেস্টিং ও কেমিক্যাল এনালাইসিসের জন্য দক্ষ লোকবল নিয়োগের নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। থানা পর্যায়ে কম্পিউটারাইজেশনের প্রাথমিক কাজ শুরু হয় বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলেই। মামলার তথ্য সংরক্ষণ, অপরাধীদের ডেটাবেজ তৈরি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নের জন্য পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদা আইটি সেল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার (Walkie-talkie/VHF) উন্নয়ন করা হয়, যাতে দ্রুত সাড়া দেওয়া যায়।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তকরণের আপোষহীন প্রয়াসঃ যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে পুলিশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক প্রভাব। একটি বাহিনী যতবার রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ করতে বাধ্য হয়, ততবার তার পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। আপোষহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তার শাসনামলে পুলিশকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখার যে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তা নিন্মে আলোচনা করা হলো…
ট্রান্সফার ও পোস্টিংয়ের স্বচ্ছতা: স্বৈরশাসনের আমলে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার ও পোস্টিং রাজনৈতিক নেতাদের ইচ্ছাধীন ছিল। বেগম খালেদা জিয়া পুলিশ সুপার (SP) ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়োগে একটি স্বচ্ছ ও সিনিয়ররিটি ভিত্তিক পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেন। তিনি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশ দেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পর্ক রাখলে তার প্রমোশন বা পোস্টিংয়ে প্রভাব পড়বে না; বরং যার যত পেশাগত দক্ষতা, তাকে তত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিতে হবে।
নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ ভূমিকা: যদিও তার শাসনামলে বিরোধী দলের অবরোধ ও হরতালের মতো কর্মসূচি চলছিল, তবুও বেগম খালেদা জিয়া পুলিশকে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে একটি নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার আমলে পুলিশকে ভোটার কেন্দ্রে দাঁড় করিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার যে রেওয়াজ শুরু হয়, তা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্যই একটি মাইলফলক ছিল।
ঊর্ধ্বতনদের মনোবল চাঙ্গা করণ: বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের আমলে চাকরিচ্যুত ও অবহেলিত বহু পুলিশ কর্মকর্তাকে পুনর্বহাল করেন এবং তাদের পদোন্নতি দেন। এর ফলে পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের কাজের প্রতি আত্মবিশ্বাস ফিরে আসে এবং তারা সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে দেশের প্রতি দায়িত্বশীল হিসেবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করতে শুরু করেন।
গ্রুপ ইনস্যুরেন্স ও ঝুঁকি ভাতা: বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে পুলিশ সদস্যদের জন্য গ্রুপ ইনস্যুরেন্সের সুবিধা আধুনিক ও কার্যকর করা হয়। পূর্বে এই সুবিধাটি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল; কিন্তু তার আমলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত পুলিশদের জন্য বিশেষ ঝুঁকি ভাতা (Risk Allowance) চালু ও বৃদ্ধি করা হয়। দায়িত্ব পালনকালে শহীদ হওয়া পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক অনুদান প্রদানের জন্য আইনি জটিলতা কমিয়ে একটি দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া চালু করা হয়।
আবাসন ঋণ ও পরিবহন সুবিধা: সরকারি বাসস্থানের সংকট মেটাতে পুলিশ সদস্যদের জন্য নিজ বাড়ি নির্মাণে স্বল্প সুদে আবাসন ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। শুধু তাই নয়, দ্বিতীয় মেয়াদে (২০০১-২০০৬) থানা পর্যায়ে পুলিশ সদস্যদের দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ও পিক-আপ ভ্যান ক্রয় করার একটি বিশাল প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর ফলে পুলিশের গতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং অপরাধীরা পুলিশের চেয়ে এগিয়ে থাকার সুবিধা হারায়।
মডেল থানা কনসেপ্ট: যদিও ‘মডেল থানা’ নামটি পরবর্তী সময়ে ব্যাপক ব্যবহার পায়, তবু থানাগুলোকে জনমুখী করার কাঠামোগত নীতিমালা বেগম খালেদা জিয়ার আমলেই প্রণয়ন করা হয়। থানার গেইট খোলা রাখা, আহত বা বিপদে থাকা মানুষকে সাহায্য করা এবং অভিযোগ দানের সুবিধার্থে একটি বিশেষ ডেস্ক থানার প্রবেশমুখে স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়।
থানা ভবনের পুনঃনির্মাণ: স্বাধীনতার পর থেকে অবহেলিত থানা ভবনগুলো ধুলিস্যাৎ হয়ে পড়েছিল। বেগম খালেদা জিয়ার আমলে সারা দেশের শত শত থানা ভবন নতুন করে নির্মাণ বা সংস্কারের একটি বিশাল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি থানা অফিসের ভেতরে আসামিদের রাখার জন্য আধুনিক লকআপ, তদন্ত কক্ষ এবং কম্পিউটারাইজড রেকর্ড রুম নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
ষোড়শ অধ্যায়ঃ বেগম খালেদা জিয়া শাসনামলে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ ছিল সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমন। ২০০১ সালের পর বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসবাদের যে ঢেউ উঠেছিল, তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছিল। দেশের অভ্যন্তরে জঙ্গী গোষ্ঠীগুলো যখন বোমা হামলা ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছিল, তখন বেগম খালেদা জিয়া পুলিশকে ব্যবহার করে সেই উগ্রবাদের উৎপাটন করেন। তার আমলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে জঙ্গীদের গ্রেপ্তার করার জন্য বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা হয়, যাতে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
সন্ত্রাস দমনে তিনি ‘ট্রাইব্যুনাল’ বা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করেন, যাতে অপরাধীরা আইনের ফাঁক গলিয়ে পার না পায়। পুলিশকে তদন্তের কাজে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা নিরপেক্ষভাবে অপরাধ প্রমাণ করতে পারে এবং আদালতে সাক্ষ্য দিতে পারে। আপোষহীন নেত্রী হিসেবে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, অপরাধ নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার অবদান একটি যুগান্তকারী অধ্যায়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অন্ধকার থেকে মুক্ত হয়ে পুলিশ বাহিনীকে গণতান্ত্রিক, আধুনিক ও জনমুখী হিসেবে গড়ে তোলার যে মহাপরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। তার শাসনামলে গৃহীত নীতিমালা, কাঠামোগত পরিবর্তন, আইনি সংস্কার ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি পুলিশের মনোবল ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে অসামান্য ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আজ যতটা স্থিতিশীল ও আধুনিক, তার পেছনে বেগম খালেদা জিয়ার পুলিশ বিনির্মাণের সেই দূরদর্শী পদক্ষেপগুলো নীরবে কাজ করছে। একজন আপোষহীন নেত্রী হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, স্বৈরশাসনের ধ্বংসস্তূপ থেকেও একটি আধুনিক ও মানবিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব, যদি নেতৃত্বে থাকে দূরদর্শিতা আর আপোষহীন মানসিকতা। তার সেই ঐতিহ্য ও পথ অনুসরণ করাই হবে বাংলাদেশ পুলিশের জন্য শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক: পুলিশ কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ প্রধান, টিডিএস