‘বসত’ বা ‘বসতি’—এই শব্দগুলোর সঙ্গে আমরা অত্যন্ত পরিচিত। একইভাবে ‘বসবাস’ শব্দটিও আমাদের নিত্যপরিচিত। মানুষের বসবাসের স্থান বোঝাতে আমরা আরও নানা শব্দ ব্যবহার করি—যেমন বসত-বসতি, ঘর-বাড়ি, বাসা ইত্যাদি। এসব শব্দের মধ্য দিয়ে মূলত মানুষের আবাসস্থল, জীবনযাপন ও বসবাসের ধারণাই প্রকাশ পায়।
একটি বাড়ি শুধু ইট, বালু, সিমেন্ট ও লোহার কাঠামো নয়। একটি বসতি শুধু কয়েকটি ভবনের সমষ্টিও নয়। মানুষের নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, চলাচলের ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান, খোলা জায়গা এবং নির্মল পরিবেশ—সব মিলিয়েই একটি পরিপূর্ণ বসতি। তাই আবাসন নির্মাণের প্রশ্নটি আসলে মানুষের জীবনমান, অর্থনীতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন।
বিশ্ব এখন দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একটা বারের জন্যও ভাবছি না আমাদের ভবিষ্যৎ কি। অধিকাংশ মানুষ নগরমুখী। আমাদের অবস্থা এমন হয়েছে নগরে থাকা মানেই ধনীদের জায়গা, নগরে থাকা মানেই শিক্ষিত। এটাও ভাবা সঠিক নয়।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ বর্তমানে নগর এলাকায় বসবাস করছে এবং ২০৫০ সালের মধ্যে এই হার প্রায় ৬৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ আগামী কয়েক দশকে কোটি কোটি মানুষ নতুন করে শহরমুখী হবে। এই বাস্তবতায় প্রশ্নটি শুধু ‘আর কত বাড়ি বানাতে হবে’—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কেমন শহর এবং কেমন বসতি আমরা তৈরি করতে চাই?
অপরিকল্পিত নগরায়নের মূল্য:
নগরায়ন নিজে কোনো সমস্যা নয়। আমরা অস্বীকার করছি না নগরকে। তবে পরিকল্পিত নগরায়ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও নাগরিক সেবা মানুষের কাছে নিয়ে আসে। শহর হতে পারে উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির কেন্দ্র। কিন্তু পরিকল্পনাহীন নগরায়ন শহরকে মানুষের বসবাসের জন্য ক্রমেই কঠিন করে তোলে।
যখন জলাধার ভরাট করে ভবন নির্মাণ হয়, খাল দখল করে রাস্তা তৈরি হয়, কৃষিজমি দ্রুত আবাসিক এলাকায় পরিণত হয়, পর্যাপ্ত খোলা জায়গা ছাড়া ঘনবসতি গড়ে ওঠে এবং আবাসিক এলাকার সঙ্গে শিল্পকারখানা বা ভারী যান চলাচলের সঠিক পরিকল্পনা থাকে না—তখন শহর তার প্রাকৃতিক ভারসাম্য হারায়।
ফলাফল আমরা দেখছি— জলাবদ্ধতা, যানজট, বায়ুদূষণ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, শব্দদূষণ, পানির সংকট, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন এবং সবুজের সংকোচন।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সমস্যাগুলোকে আরও তীব্র করে তুলছে। UN-Habitat-এর World Cities Report 2024 বলছে, শহরগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সম্মুখসারিতে রয়েছে—বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঝড়, খরা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ঝুঁকি ক্রমেই নগর জীবনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এমনকি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জলবায়ু পরিস্থিতিতে কার্যত কোনো নগরবাসীই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত থাকবে না।
পৃথিবী কি বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে?
প্রশ্নটি উদ্বেগজনক, কিন্তু এর সরল উত্তর নেই। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কত শতাংশ এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে—এমন কোনো একক বৈজ্ঞানিক পরিমাপ নেই। কারণ ‘বাসযোগ্যতা’ শুধু জমির ওপর নির্ভর করে না; পানি, তাপমাত্রা, বন্যার ঝুঁকি, খাদ্য, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও মানুষের অভিযোজনক্ষমতাও এর সঙ্গে জড়িত।
তবে ঝুঁকি যে বাড়ছে, তার প্রমাণ স্পষ্ট
UN-Habitat-এর ২০২৬ সালের World Cities Report অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অপর্যাপ্ত আবাসনের মধ্যে বসবাস করছে। এর মধ্যে ১.১ বিলিয়নের বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে বাস করছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদ, সুরক্ষিত ও পর্যাপ্ত আবাসনের ঘাটতি ২০১০ সালের ২৫১ মিলিয়ন ইউনিট থেকে ২০২৩ সালে ২৮৮ মিলিয়ন ইউনিটে পৌঁছেছে।
অর্থাৎ পৃথিবীর সংকট শুধু ‘বাড়ি কম’—এমন নয়। অনেক মানুষের বাড়ি আছে, কিন্তু সেই বাড়ি নিরাপদ নয়; অনেকের ঘর আছে, কিন্তু পানি নেই; কারও ঘর আছে, কিন্তু পয়োনিষ্কাশন নেই; কারও ঘর আছে, কিন্তু কর্মস্থল থেকে এত দূরে যে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
সুতরাং বসতি মানে শুধু একটি ছাদ নয়; বসতি মানে একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনব্যবস্থা।
বাংলাদেশের বাস্তবতা আরও গুরুত্বপূর্ণ:
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩ শতাংশ নগর এলাকায় বসবাস করছিল। একই সঙ্গে নগর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও উল্লেখযোগ্য।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ বেড়েছে; এর একটি বড় অংশ এসেছে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তরের মাধ্যমে। এই নগরায়নের একটি বড় চাপ পড়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ওপর।
বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামীণ এলাকার মানুষের একটি অংশ ভবিষ্যতে কাজ, নিরাপত্তা ও জীবিকার সন্ধানে শহরমুখী হতে পারে। ফলে নগরায়ন শুধু অর্থনৈতিক কারণে নয়, জলবায়ু বাস্তুচ্যুতির কারণেও দ্রুততর হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে শহরগুলোতে অতিরিক্ত তাপ, নগর বন্যা, উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোর দুর্বলতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, সাশ্রয়ী ও সহনশীল আবাসন এবং প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ঢাকাকে কি শুধু আরও উঁচু করতে হবে?
আমাদের নগর পরিকল্পনার একটি বড় প্রশ্ন এখানেই। ঢাকায় জমির সংকট আছে—এ কথা সত্য। তাই বহুতল ভবন দরকার হতে পারে। কিন্তু শুধু ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে আবাসন সমস্যার সমাধান করা যায় না।
একটি ২০ তলা ভবনের পাশে যদি পর্যাপ্ত খেলার মাঠ না থাকে, হাঁটার পথ না থাকে, গাছ না থাকে, পর্যাপ্ত পার্কিং না থাকে, গণপরিবহন না থাকে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকে, স্কুল-হাসপাতাল দূরে থাকে—তাহলে সেটিকে পরিকল্পিত আবাসন বলা কঠিন।
উল্লম্ব ভবন পরিকল্পিত হতে পারে, কিন্তু উল্লম্ব বিশৃঙ্খলাও সম্ভব। তাই ভবন নির্মাণের অনুমোদনের সঙ্গে এলাকাভিত্তিক পরিবহন, পানি, বিদ্যুৎ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খোলা স্থান, জরুরি সেবা ও জলবায়ু ঝুঁকির হিসাব যুক্ত করতে হবে।
জলাধার ও সবুজ এলাকা কোনো ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ নয়, আমাদের নগর পরিকল্পনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন দরকার—খাল, জলাধার, নদী, নিম্নভূমি, পার্ক ও গাছকে উন্নয়নের বাধা হিসেবে দেখা যাবে না। এগুলো শহরের প্রাকৃতিক অবকাঠামো।
বৃষ্টির পানি কোথায় যাবে, শহরের তাপ কীভাবে কমবে, ভূগর্ভস্থ পানি কীভাবে পুনর্ভরণ হবে, মানুষ কোথায় হাঁটবে বা বিশ্রাম নেবে—এসবের সঙ্গে সবুজ ও জলাভূমির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একটি শহর যত বেশি কংক্রিটে ঢেকে যাবে, বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ তত কমবে। অন্যদিকে গাছ ও সবুজ এলাকা কমলে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাব বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাই ‘গ্রে ইনফ্রাস্ট্রাকচার’— রাস্তা, সেতু, ভবন, ড্রেন—এর পাশাপাশি ‘গ্রিন ও ব্লু ইনফ্রাস্ট্রাকচার’— গাছ, পার্ক, খাল, জলাধার ও জলাভূমি—সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আবাসন হতে হবে সাশ্রয়ীও:
পরিকল্পিত আবাসনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সাশ্রয়ী মূল্য। একটি বাড়ি যদি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে সেটি সামাজিক অর্থে আবাসন সমস্যার সমাধান করতে পারে না। বিশ্বজুড়ে আবাসন সংকটের অন্যতম কারণই হলো উচ্চ মূল্য, জমির দাম, অনিরাপদ দখল এবং মানুষের আয়ের তুলনায় আবাসনের ব্যয় বৃদ্ধি। UN-Habitat-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে আবাসনকে দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও জলবায়ু সহনশীলতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা হয়েছে। তাই নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক ও সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াভিত্তিক আবাসন, স্বল্পসুদের অর্থায়ন এবং পরিকল্পিত উপশহর গড়ে তোলার মতো উদ্যোগ জরুরি।
শুধু ধনীদের জন্য সুন্দর আবাসিক এলাকা তৈরি করলে একটি শহর টেকসই হয় না। পরিচ্ছন্নতাকর্মী, পরিবহনকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, শিক্ষক, নার্স, দোকানি— শহরকে সচল রাখা মানুষগুলোর জন্যও শহরের ভেতর বা যুক্তিসংগত দূরত্বে নিরাপদ আবাসন দরকার।
শুধু নতুন শহর নয়, নতুন চিন্তাও দরকার:
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগরায়নের ক্ষেত্রে শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরের শহর, শিল্পকেন্দ্র, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা গেলে ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব।
বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল মাধ্যমিক শহরগুলোর উন্নয়নের মাধ্যমে জলবায়ু অভিবাসীদের ধারণ করার এবং ঢাকার ওপর চাপ কমানোর গুরুত্ব তুলে ধরেছে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের নগর পরিকল্পনা হতে হবে বহুকেন্দ্রিক—সব সুযোগ-সুবিধা এক শহরে কেন্দ্রীভূত নয়; বরং বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও আবাসনের সুযোগ ছড়িয়ে দিতে হবে।
আগামী দিনের পরিকল্পিত বসতি কেমন হবে?
আমাদের ভবিষ্যৎ বসতি এমন হওয়া উচিত যেখানে —জলাধার, খাল, নদী ও জলাভূমি দখল করা হবে না;প্রতিটি আবাসিক এলাকায় পর্যাপ্ত সবুজ ও খোলা স্থান থাকবে; হাঁটার উপযোগী ফুটপাত ও নিরাপদ সাইকেলপথ থাকবে; গণপরিবহন হবে পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু; আবাসন হবে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও জলবায়ু-সহনশীল; বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনার জন্য পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম নিষ্কাশনব্যবস্থা থাকবে; ভবন নির্মাণে শক্তি সাশ্রয়, প্রাকৃতিক আলো-বাতাস ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়বে; বর্জ্য আলাদা করা, পুনর্ব্যবহার ও নিরাপদ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা থাকবে; স্কুল, হাসপাতাল, বাজার ও কর্মস্থল আবাসিক এলাকার সঙ্গে যুক্ত থাকবে; বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও অন্যান্য দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করে ভূমি ব্যবহার নির্ধারণ করা হবে; নিম্ন আয়ের মানুষ ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ না করে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হবে।
কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে একটি ভবনকে শুধু আজকের আবহাওয়া দিয়ে পরিকল্পনা করলে চলবে না; আগামী কয়েক দশকের ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ভবিষ্যতের শহর তৈরির সুযোগ এখনই:
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের আশাবাদী করে। UN-Habitat-এর ২০২৬ সালের World Cities Report বলছে, ২০৫০ সালে পৃথিবীতে যে ভবনগুলো থাকবে, তার প্রায় ৬০ শতাংশ এখনো নির্মিত হয়নি। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ নগর ও আবাসন ব্যবস্থা কীভাবে গড়ে উঠবে, তা পরিবর্তনের সুযোগ এখনো আমাদের হাতে রয়েছে।
এই সুযোগটি কাজে লাগাতে হলে উন্নয়নকে শুধু ‘কতটি ভবন নির্মাণ হলো’ দিয়ে মাপলে চলবে না। মাপতে হবে—কতটা নিরাপদ, কতটা সবুজ, কতটা সাশ্রয়ী, কতটা জলবায়ু-সহনশীল এবং কতটা মানুষের জন্য বাসযোগ্য হলো। কারণ একটি শহরের আসল সৌন্দর্য তার উঁচু ভবনে নয়; তার মানুষ কতটা নিরাপদে, স্বস্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।
নগরে নতুন ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বাসযোগ্য হতে পারে:
নতুন ভবন নির্মাণের সঙ্গে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা (রুফটপ সোলার) স্থাপন করা হলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যয়ও সাশ্রয় করা সম্ভব। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে পরিবেশবান্ধব ও বাসযোগ্য নগর পরিবেশ গড়ে তোলার পথ আরও সুগম হবে। এ বিষয়টির গুরুত্ব সরকারও ইতোমধ্যে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে বড় ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে সরকার। বাড়ি, প্রতিষ্ঠান কিংবা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে সোলার সিস্টেম স্থাপন করে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
রুফটপ সোলারের সুবিধাগুলো এমন হতে পারে-
১. বিদ্যুৎ বিল কমায় — নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমে।
২. জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমায় — কয়লা, গ্যাস ও তেলের মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করে।
৩. নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ায় — সূর্যের আলো ব্যবহার করে পরিচ্ছন্ন ও টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
৪. কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করে — সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না।
৫. দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী — প্রাথমিক বিনিয়োগের পর তুলনামূলক কম পরিচালন ব্যয়ে বহু বছর বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়।
৬. ভবনের অব্যবহৃত ছাদের সর্বোত্তম ব্যবহার — অতিরিক্ত জমি ব্যবহার না করেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়।
৭. বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ কমায় — দিনের বেলায় ভবনের নিজস্ব চাহিদার একটি অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা সম্ভব।
৮. জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়ায় — বিদ্যুতের একটি অংশ নিজস্বভাবে উৎপাদন করায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমে।
৯. পরিবেশবান্ধব নগরায়ণে সহায়তা করে — ভবনগুলোকে আরও টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে তুলতে ভূমিকা রাখে।
১০. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টেকসই পরিবেশ তৈরি করে — পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাসযোগ্য পরিবেশ গঠনে সহায়তা করে।
পরিশেষে- আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বসতি মানুষের মৌলিক প্রয়োজন। কিন্তু ভবিষ্যতের বসতি হতে হবে এমন, যেখানে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সংঘাত নয়, সহাবস্থান তৈরি হবে। আমাদের উন্নয়ন দরকার, কিন্তু এমন উন্নয়ন নয় যা নদীকে মেরে শহর বানায়; জলাভূমি ভরাট করে আবাসিক এলাকা বানায়; গাছ কেটে তাপ বাড়ায়; কিংবা নিম্ন আয়ের মানুষকে শহরের প্রান্তে ঠেলে দেয়। আমাদের দরকার পরিকল্পিত নগরায়ন, পরিকল্পিত আবাসন এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। আজ যে শহর আমরা নির্মাণ করছি, আগামী প্রজন্ম সেখানেই বসবাস করবে। তাই প্রশ্ন শুধু—’কত বড় শহর বানাব?’
প্রশ্ন হওয়া উচিত— ‘কতটা বাসযোগ্য শহর রেখে যাচ্ছি?’ মানুষের জন্য বাড়ি চাই, কিন্তু সেই বাড়ির চারপাশে চাই বাতাস, পানি, গাছ, আলো, নিরাপদ রাস্তা, কর্মসংস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। বসতি হোক মানুষের অধিকার, নগর হোক প্রকৃতির অংশ—এই হোক আমাদের আগামী দিনের নগর দর্শন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট