Friday 09 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

পুজোয় চাই কাঁসার তৈজসপত্র

ফারহানা নীলা
৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:১১ | আপডেট: ৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:১৯

বাঙালির শিল্পবোধ ও গৃহস্থালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকেই আসন গেড়ে আছে কাসার তৈজসপত্র। তাম্র ও টিনের নিখুঁত মিশ্রণে তৈরি এই সংকর ধাতু কেবল খাবার পরিবেশনের মাধ্যম ছিল না, বরং তা ছিল পরিবারগুলোর সামাজিক মর্যাদা ও আভিজাত্যের অন্যতম প্রতীক। জমিদারি আমল থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রামীণ পরিবারে কাসার থালা, বাটি, ঘটি, জলখাবার পাত্র ও প্রদীপ বংশানুক্রমে পরিবাহিত হতো। বিশেষ করে ঢাকার ধামরাই, জামালপুরের ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ এবং টাঙ্গাইলের কাগমারী অঞ্চলে তৈরি কাঁসাশিল্প ছিল বিশ্বজোড়া খ্যাতির অধিকারী। হাতের নিখুঁত কারুকাজ ও হাতুড়ির পিটুনিতে তৈরি এসব ধাতব বাসনপত্র ছিল দীর্ঘস্থায়ী এবং স্বাস্থ্যসম্মত। হাজার বছরের এই লোকশিল্প আমাদের ইতিহাসকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি আবহমান বাংলার জীবনধারায় এক স্বতন্ত্র নান্দনিক মাত্রা যোগ করেছে।

বিজ্ঞাপন

শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কাসার সুবর্ণ বাজার

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচাইতে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে এখন কাসার তৈজসপত্র ও শোপিসের বেচাবিক্রি তুঙ্গে উঠেছে। পূজার মণ্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে দেবী দুর্গার আরতি, নৈবেদ্য প্রদান এবং প্রসাদ বিতরণে কাসার ঘটি, পঞ্চপ্রদীপ, কোশা-কুশী, ঘণ্টাধ্বনি ও প্রদীপদানির বিকল্প নেই। উৎসবের মৌসুমে ঘরের আভিজাত্য বাড়াতে এবং আত্মীয়স্বজনদের উপহার দিতেও মানুষ কাসার সামগ্রীকে প্রথম পছন্দ হিসেবে নিচ্ছেন। বৈদিক ঐতিহ্য অনুযায়ী কাসার পাত্রে পুজো দেওয়াকে অত্যন্ত পবিত্র বলে গণ্য করা হয়, যা এই উৎসবকালে এর চাহিদাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। কারিগরদের রাতভর ব্যস্ততা এবং হাটবাজার থেকে শুরু করে অভিজাত শপিংমলগুলোতে উৎসবপ্রিয় ক্রেতাদের ভিড় প্রমাণ করে যে আধুনিকতার ভিড়েও কাসার আবেদন এতটুকু কমেনি।

গৃহিণী ও রমনীদের পছন্দের শীর্ষে ঐতিহ্যবাহী কাসা

রান্নাঘরের রোজকার ব্যস্ততা থেকে শুরু করে বসার ঘর সাজানো কিংবা উৎসবের প্রস্তুতি প্রতিটি ক্ষেত্রেই রমনীদের প্রথম পছন্দের তালিকায় সবসময়ই রয়েছে কাসার পাত্র। আধুনিক যুগে হরেক রকমের বাসনপত্রের ভিড় থাকলেও রুচিশীল গৃহিণীরা আজও ঘরের আভিজাত্য ফোটাতে কাসার বিকল্প কিছু ভাবেন না। অতিথি আপ্যায়নে কাঁসার থালা-বাটিতে পরিবেশন যেমন ভোজনরসিকদের মনে এক আলাদা তৃপ্তি এনে দেয়, তেমনি রমনীরা নিজেদের শখের রান্নাঘর ও ডাইনিং টেবিলকে রাজকীয় ছোঁয়ায় সাজাতে কাসার বাসনকেই বেছে নেন। কেবল রান্নাবান্না ও খাবার পরিবেশনেই সীমাবদ্ধ নয়, ঘরের কোণে কাসার অ্যান্টিক শোপিস সাজিয়ে রাখা কিংবা পুজোর শুভ মুহূর্তে শুভ্রতার প্রতীক হিসেবে কাসার প্রদীপ ও পাত্র ব্যবহার করা যেন রমনীদের নান্দনিক জীবনযাপনেরই অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

ঘরের সাজসজ্জায় কাসার আধুনিক শোপিস ও ঘরের নান্দনিকতা

বর্তমানে কাসার বাসনপত্র শুধু রান্নাঘর বা খাওয়ার টেবিলেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং গৃহসজ্জার আধুনিক ঘরানায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে এর শোপিস ও প্রাচীন শৈলীর পণ্য। রুচিশীল মানুষেরা এখন বসার ঘরের শোভা বাড়াতে কাসার তৈরি নকশাদার ফুলদানি, রাজকীয় মোমবাতিদান, দেওয়াল টাঙানোর থালা, নটরাজ মূর্তি, গণেশ প্রতিমা, অ্যান্টিক ঘণ্টা এবং ঐতিহ্যবাহী সুরাই কিনে ঘরে সাজিয়ে রাখছেন। কাঠের আসবাব কিংবা আধুনিক অন্দরসজ্জার সঙ্গে কাসার সোনালি আভাময় ঐতিহ্যগত লুক এক অপূর্ব বৈপরীত্য তৈরি করে, যা মুহূর্তে ঘরের পরিবেশকে রাজকীয় ও মার্জিত করে তোলে। শখ করে কেনা এসব ঐতিহ্যবাহী শোপিস যেমন অতিথিকে মুগ্ধ করে, তেমনি ঘরের মালিকের নন্দনবোধ ও ঐতিহ্যপ্রীতির এক দারুণ প্রকাশ ঘটায়।

বাজারের দরদাম ও কোথায় পাবেন ঐতিহ্যবাহী এই পণ্য

রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই এখন সহজে আসল কাসার সামগ্রী খুঁজে পাওয়া যায়। ঢাকার ধামরাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কাঁচাবাজার ও শোরুমগুলো কাসার তৈরি আসল পণ্যের জন্য সেরা স্থান। এছাড়া নিউ মার্কেট, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, আড়ং, গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন অ্যান্টিক শোপিসের দোকান এবং বায়তুল মোকাররম মার্কেট সংলগ্ন দোকানগুলোতে প্রচুর কাসার সম্ভার রয়েছে। আজকাল বিভিন্ন বিশ্বস্ত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ই-কমার্স সাইটেও মেপে কাসার পণ্য কেনার সুযোগ রয়েছে। দরদামের ক্ষেত্রে ওজন ও কারুকাজের ওপর নির্ভর করে দাম নির্ধারিত হয়। কাসার সাধারণ থালা বা প্লেট আকারভেদে ১৫০০ টাকা থেকে ৩৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। কাসার জল পানের গ্লাস ও গ্লাস সেট ৮০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা, বাটি ৫০০ টাকা থেকে ১২০০ টাকা এবং সম্পূর্ণ ডিনার সেট ৪০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকার মধ্যে কেনা সম্ভব। আর গৃহসজ্জার কাসার শোপিস, মোমবাতিদান কিংবা ধর্মীয় পূজাসামগ্রী ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে নকশাভেদে ১৫০০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। সাধারণত প্রতি কেজি কাসার পণ্য এর গুণগত মান ও ফিনিশিং ভেদে ২৪০০ টাকা থেকে ৩২০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়।

সুস্থ জীবনযাপন ও কাসার পাত্রে খাবার গ্রহণের উপকারিতা

আধুনিক স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং প্রাচীন আয়ুর্বেদ শাস্ত্র অনুযায়ী কাসার পাত্রে খাবার ও জল গ্রহণ স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী। কাসার ধাতব গুণাগুণ শরীরে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে সহায়তা করে এবং জলের ক্ষারীয় ভারসাম্য বজায় রাখে। এই পাত্রে রাখা জল নিয়মিত পানে পরিপাকতন্ত্র ভালো থাকে, থাইরয়েডের ভারসাম্য বজায় থাকে এবং ত্বকের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া প্লাস্টিক বা মেলমাইনের ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্য সচেতন মানুষেরা এখন আবার কাসার বাসনে ফিরে আসছেন। দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরও সঠিক নিয়মে তেঁতুল বা লেবু দিয়ে মেজে নিলে কাসার পাত্র আবার তার নতুন সোনালি রূপ ফিরে পায়, যা একে যুগের পর যুগ টেকসই ও পরিবেশবান্ধব করে রাখে।

ছবি: শঙ্খলতা

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

পুজোয় চাই কাঁসার তৈজসপত্র
৯ অক্টোবর ২০২৬ ১৭:১১

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর