রংপুর: উত্তরাঞ্চলে পৌষে বেশ কয়েকদিন তীব্র শীত ও কুয়াশা ছিল। বর্তমানে শীত কিছুটা কমলেও কুয়াশা রয়েই গেছে। আর এ কারণে বোরো ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা চাষিদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বীজতলার চারা হলুদ ও রোগাক্রান্ত হওয়ায় কৃষকরা পলিথিন দিয়ে ঢেকে ও পানিতে ডুবিয়ে রাখে। এমনকি ছত্রাকনাশক স্প্রে করার মতো জরুরি ব্যবস্থা নিলেও কোনো কাজেই আসছে না।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি অফিসের কোনো পরামর্শই তারা পান না। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এই বৈরী আবহাওয়ায় বীজতলা রক্ষায় কৃষকদের বিশেষ পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যাতে চলতি মৌসুমে পাঁচ জেলায় পাঁচ লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যায়।
পীরগঞ্জ উপজেলার চতরা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান এক একর জমির জন্য চার কেজি ধানের বীজতলা তৈরি করেছেন। একই এলাকার সুরুজ মিয়া চার একর এবং মুকুল মিয়া তিন একর জমির জন্য বীজতলা প্রস্তুত করেছেন। তাদের বীজতলার বয়স মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু শীত ও কুয়াশার কারণে চারা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তারা চিন্তিত। তারা জানান, এই অবস্থা আর এক সপ্তাহ চললে বীজতলা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে।
রংপুর নগরীর পানবাজার এলাকার চাষি শুভঙ্কর ঢালি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এক দোন (২৪ শতক) জমির চারা কিনতে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু, বীজতলা নষ্ট হলে দাম আরও বাড়বে।’ পীরগাছা উপজেলার কল্যানি ইউনিয়নের কৃষক নজরুল ইসলাম বুলবুলসহ অনেকে একই দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, কৃষি বিভাগ থেকে যদি সঠিক সময়ে পরামর্শ দিতো তাহলে বৈরী পরিস্থিতিতেও বীজতলা রক্ষা করা যেত।
বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রবি ফসল যেমন সরিষা, আলু, গম ও তামাক উত্তোলনের পর সেই জমিতে বোরো আবাদের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু বৈরী আবহাওয়া সবকিছুকে বাধাগ্রস্ত করছে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, দীর্ঘস্থায়ী নিম্ন তাপমাত্রা এবং ঘন কুয়াশা বোরো চারাকে রোগাক্রান্ত করে, যা ফলন ও গুণগত মান কমিয়ে দেয়। অতীতে এমন আবহাওয়ায় চারা হলুদ হয়ে যাওয়া এবং ছত্রাক রোগের প্রকোপ দেখা গেছে, যা ফসলের উৎপাদনকে ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দিতে পারে। রংপুর অঞ্চলে এই সমস্যা পুনরাবৃত্ত হয়, বিশেষ করে হাওর এলাকায় শীতকালীন ঠান্ডা এবং ফ্ল্যাশ ফ্লাডের কারণে বোরো ধানের ক্ষতি হয়।

রংপুরে শীত-কুয়াশায় বিপর্যয়ের মুখে বোরো বীজতলা। ছবি: সংগৃহীত
তবে কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা, রাতে পানিতে ডুবিয়ে রাখা, সালফারযুক্ত ওষুধ ছিটানো এবং জিপসাম ও ইউরিয়া প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায়, রংপুরে তাপমাত্রা ১০ থেকে ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলেও উচ্চ আর্দ্রতা (১০০%) এবং সকালের কুয়াশার সম্ভাবনা রয়েছে, যা চারার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আগামী দিনগুলোতে আবহাওয়া উন্নতির পূর্বাভাস রয়েছে, যা চারা রোপণকে সহজ করবে।’
তবে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান রিপন সারাবাংলাকে বলেন, ‘যথাযথ পরিচর্যা এবং আবহাওয়া মনিটরিংয়ের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করে রেকর্ড ফলন অর্জন সম্ভব, যেমনটি ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রত্যাশিত। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমন ঘটনা বাড়তে পারে, যা কৃষি নীতিতে বিবেচনা করা দরকার।’
উল্লেখ্য, জাতীয় পর্যায়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বোরো ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ টন। যার মধ্যে রংপুর বিভাগে ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৪ হেক্টর জমিতে ২৩ লাখ ৮ হাজার ৭৭২ টন পরিষ্কার চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ২৩ হাজার ১৭৫ হেক্টর, যা পাঁচ জেলা— নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় বাস্তবায়িত হবে।