শরীয়তপুর: ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাঁচিকাটা ইউনিয়ন শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। পদ্মা ও মেঘনা নদীর কারণে ইউনিয়নটি উপজেলা থেকে প্রায় বিছিন্ন। এই অঞ্চলের ২২,৮৮৭ জন ভোটারের ৬ টি ভোট কেন্দ্র নিয়ে নিরাপত্তার শঙ্কা রয়েছে।
কাঁচিকাটা ইউনিয়নের একপাশে মুন্সিগঞ্জ অন্যপাশে চাঁদপুরের মোহনা। একারণেই এই অঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা চাঁদপুর কিংবা মুন্সিগঞ্জের সঙ্গে। এই ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। পেশা কৃষি এবং মাছ ধরা।
মূল উপজেলা থেকে বিচ্ছন্ন হওয়ায় এবং ভৌগোলিক অবস্থান ও যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্থানীয় ভোটার ও জনপ্রতিনিধিরা।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার কাঁচিকাটা ইউনিয়নটি নদীবেষ্টিত হওয়ায় বর্ষা কিংবা শুকনো মৌসুমে নৌপথ ছাড়া অন্য কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যকর থাকে না। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতীতের নির্বাচনে এখানে বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার নজির থাকায় এবারও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
এ অবস্থায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে ইউনিয়নে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা মোয়াজ্জেম হোসেন মিলন বকাউল।
আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার কাঁচিকাটা ইউনিয়নের একপাশে মুন্সিগঞ্জ অপর পাশে চাঁদপুর হওয়ায় তিন জেলার মোহনা এই ইউনিয়নটি। যেকারণেই নির্বাচন এলে এখানে মারামারি হানাহানি বেড়ে যায়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে অন্য জেলা থেকে লোকজন এনে মারামারিতে জড়িয়ে যায় প্রার্থীরা। পুলিশের পক্ষে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাই বেগ পেতে হয়।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অবৈধ অস্ত্র, টেটা যুদ্ধ ও দেশিও অস্ত্রের ঝনঝনানি বেড়ে যায়। এতে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসতে ভয় পায়। তাই ভোটের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ এবং ভোটকেন্দ্রের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প জরুরি। অতীতে নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচনের পরে সংঘর্ষের একাধিক নজির রয়েছে কাঁচিকাটায়। এছাড়াও নড়িয়া উপজেলার চরআত্রা, নওপাড়া ও গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ও কুচাইপট্টি ইউনিয়নের কিছু অংশ নদীবেষ্টিত হওয়ায় সেখানে ঝুকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন মিলন বকাউল বলেন, ‘আমাদের কাঁচিকাটা ইউনিয়নটি চলাঞ্চলের হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প থাকলে ভোটারদের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি দ্রুত মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।’
কাঁচিকাটা মরিচা কান্দি এলাকার ভোটার রতন মিয়া (৬০) বলেন, এইবার ভোট দিতে জাইমু না। গতবার উপজেলা নির্বাচনে ভোট দিয়া আহার সময় ভোট কেন্দ্রের পাশে দুপক্ষের মধ্যে মারামারি লাইগা আমার শরীরে আঘাত পাইছি। হেই ব্যথায় বহুদিন কাম করতে পারি নায়। মারামারির সময় পুলিশ থাকলেও তাগো লোক কম আছিলো এই লেইগ্যা মারামারি থামাইতে দেরি হইছে। আমাগো নিরাপত্তা নাই। যদি গতবারের মতো এইবারও ঝামেলা হয় তাই ভোট দিতে যামু না। নিরাপত্তা পেলে ভোট দিবেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ তয় তো দিমুই যদি পুলিশ আমাগো নিরাপত্তা দিতে পারে তাহলে অবশ্যই ভোট দিতে যামু বাজান।
উত্তর মাথাভাঙা এলাকার বাসিন্দা রাজিব হোসেন (১৯)। এবারের সংসদ নির্বাচনে প্রথম ভোটার রাজিব। কাঁচিকাটার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের এই ইউনিয়নটিতে নির্বাচন আসলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। যে পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক দরকার সে পরিমাণ এখানে থাকে না। এই কারণে প্রতিবারই নির্বাচন এলে মারামারি হানাহানি ঘটে। অনেক মানুষ ভয়ে ভোট দিতে যায় না। আমি মনে করি এখানে স্থায়ী একটি সেনাবাহিনী ক্যাম্প হলে এই অঞ্চলের মানুষ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে যেতে পারবে।
কাঁচিকাটা ভাঙ্গা স্কুল এলাকার বাসিন্দা সোহেল মিয়া (৩৫) বলেন, আমাদের বাড়ী ভেদরগঞ্জ উপজেলায় হলেও রাস্তাঘাট না থাকায় নদীপথে চাঁদপুরে যাতায়াত করি। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেকটাই খারাপ সে কারনে অনেক মানুষ ভোট কেন্দ্রে যায় না। এখানে নির্বাচন এলে অবৈধ অস্ত্র, টেটা যুদ্ধের মতো ঘটনাও ঘটে। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে দু গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। তাই সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে অতীতের মতো এবার সেখানে ভোটার উপস্থিতি কম হবে।
এ বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার ভেদরগঞ্জ সার্কেল সৌম্য শেখর পাল বলেন, কাঁচিকাটা ইউনিয়ন একটু নদীবেষ্টিত হওয়ার কারণে ওখানে যাতায়াতে কিছুটা সমস্যা আছে। উর্ধতন কতৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে সেখানে প্রয়োজনে পুলিশের ফোর্স বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এছাড়াও নির্বাচন যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড অথবা সহিংসতা প্রতিরোধে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক বলেন, কাঁচিকাটায় অতীতের কর্মকাণ্ডের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। নির্বাচনের দু’দিন আগে থেকেই সেনাবাহিনীর দুটি টহল গাড়ী রাখা হবে। নির্বাচনের দিন দুজন ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে কাজ করবে। পাশাপাশি বিজিবিসহ অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য ভোটারদের নিরাপত্তায় কাজ করবেন।