Sunday 15 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

সমুদ্রে জীবিকার অসম লড়াই
ফিশিং ট্রলারের দাপটে কাঠের ট্রলারের টিকে থাকার সংগ্রাম

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ মার্চ ২০২৬ ০৮:০০

কক্সবাজার: একসময় কক্সবাজার উপকূলের সমুদ্র মানেই ছিল মাছের প্রাচুর্য। জাল ফেললেই মিলত রূপালি ইলিশ, লইট্টা, চিংড়ি কিংবা রূপচাঁদা। এখন সেই দৃশ্য দ্রুত বদলে গেছে। জালে মাছ কমছে, অথচ সমুদ্রে নৌকার সংখ্যা বাড়ছে। এই বৈপরীত্যের মাঝেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে এক কঠিন বাস্তবতা। শক্তিশালী শিল্প ট্রলার বনাম প্রান্তিক ছোট জেলের কাঠের ট্রলার। এ লড়াই শুধু মাছ ধরার নয়। এটি জীবিকা, ন্যায্যতা ও উপকূলের ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্ন।

মাছের মজুত কমছে, উদ্বেগ বাড়ছে

সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে ২৬৩টি নিবন্ধিত বাণিজ্যিক বা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলার রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২২০টি নিয়মিত গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ করে। তবে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, সক্রিয় ট্রলারের প্রকৃত সংখ্যা আড়াইশ’র কাছাকাছি।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে উপকূলীয় এলাকায় মাছ ধরার জন্য রয়েছে ৬৫ হাজারের বেশি ছোট যান্ত্রিক নৌকা ও ট্রলার। একই সামুদ্রিক সম্পদের ওপর নির্ভর করছে দুই ভিন্ন শক্তির বহর। একদিকে উচ্চক্ষমতার ইঞ্জিন ও ভারী জাল নিয়ে শিল্প ট্রলার, অন্যদিকে স্বল্প পুঁজি ও ঋণনির্ভর ছোট জেলে।

সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সমুদ্র সমীক্ষায় বঙ্গোপসাগরে ছোট প্যালাজিক প্রজাতির মাছের মজুত গত কয়েক বছরে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত আহরণ ও নিয়ন্ত্রণহীন ট্রলিং এ ক্ষেত্রে বড় কারণগুলোর একটি।

উপকূলে একই হতাশা

কক্সবাজার সদর, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়া, উখিয়া ও টেকনাফ। সব উপকূলেই ছোট জেলেদের কণ্ঠে একই আক্ষেপ। মহেশখালীর গোরকঘাটা এলাকার জেলে শাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আগে একবার সমুদ্রে গেলে যা আয় হতো, এখন পাঁচ বারেও তা হয় না। খরচ বাড়ছে, মাছ কমছে। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।’

জানা গেছে, জেলেদের বড় অংশ এখন দাদননির্ভর। মহাজনের কাছ থেকে আগাম টাকা নিয়ে সমুদ্রে নামেন তারা। মাছ না পেলে সেই ঋণ পরিণত হয় দীর্ঘমেয়াদি বোঝায়। স্থানীয় জেলে সংগঠনের নেতা মো. আয়ুব বলেন, ‘অনেকেই এখন ঋণের চক্রে আটকে পড়েছেন। মাছ কমলে শুধু আয় কমে না, স্বাধীনতাও কমে যায়।’

অভিযোগের তীর শিল্প ট্রলারের দিকে

জেলেদের অভিযোগ, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অনুমতি থাকলেও অনেক শিল্প ট্রলার উপকূলের ২০-৩০ নটিক্যাল মাইলের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে উপকূলীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, সূক্ষ্ম জাল দিয়ে পোনা ও ডিমসহ সবকিছু তুলে নেওয়া হয়। ট্রলারের শক্তিশালী আলো ও শব্দে মাছ সরে যায়। একবার ট্রলার গেলে কয়েক দিন ওই এলাকায় মাছ পাওয়া যায় না।

পেকুয়ার জেলে শাকের উল্লাহ বলেন, ‘আমরা ছোট ট্রলার নিয়ে যাই। ট্রলিং এলে সমুদ্রে আর কিছুই থাকে না। তাই খালি হাতে ফিরতে হয়।’

যা বলছেন মৎস্য গবেষকেরা

মৎস্য গবেষকেরা বলছেন, মাছ কমে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। অতিরিক্ত আহরণ, প্রজনন মৌসুমে পোনা ধরা, ক্ষতিকর জাল ব্যবহার, সমুদ্র দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন। সব মিলিয়ে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র চাপের মুখে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মাছের প্রজনন চক্র ভেঙে গেলে কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো স্টক ধসে পড়তে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণহীন ট্রলিং দীর্ঘমেয়াদে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, বঙ্গোপসাগরে মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণও বাড়ছে, যা মাছের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি মাছের বিচরণক্ষেত্র বদলে দিচ্ছে।

আইন প্রয়োগে ঘাটতি

বাংলাদেশের মৎস্য আইনে গভীর সমুদ্র ও উপকূলীয় মাছ ধরার জন্য নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। বছরে নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্রে মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। ট্রলারের লাইসেন্স ও চলাচলেও বিধিনিষেধ আছে। তবে ছোট ট্রলারের জেলেদের অভিযোগ, আইন প্রয়োগে বৈষম্য রয়েছে। তাদের দাবি, নিষেধাজ্ঞা মানতে হয় মূলত ছোট জেলেদের। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা তুলনামূলক কম। সেই সঙ্গে সমুদ্রে নজরদারি সীমিত।

সম্প্রতি কোস্ট গার্ড কক্সবাজার উপকূলে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি অবৈধ ট্রলিং বোট ও জাল জব্দ করেছে। তবে জেলেদের ভাষ্য, এ ধরনের অভিযান নিয়মিত ও কার্যকর না হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।

দায় নিতে রাজি নয় ফিশিং ট্রলার মালিকরা

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলার মালিকেরা অবশ্য পুরো দায় নিতে রাজি নন। তাদের দাবি, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও শিল্প দূষণও মাছ কমে যাওয়ার পেছনে দায়ী।

চট্টগ্রামের ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলার মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা বৈধ লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করি। সব দায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফিশিং ট্রলারের ওপর চাপানো ঠিক নয়। সমুদ্রের সমস্যা বহুস্তরীয়।’

তার মতে, বড় ট্রলার বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও ভূমিকা রাখছে। তাই নিয়ন্ত্রণ দরকার হলেও পুরো শিল্প খাতকে দোষারোপ করা উচিত নয়।

নিষেধাজ্ঞা ও সহায়তায় অসন্তোষ

প্রতি বছর মাছের প্রজনন মৌসুমে সরকার সমুদ্রে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়। এ সময় নিবন্ধিত জেলেদের জন্য চাল সহায়তা দেওয়া হয়। তবে জেলেদের অভিযোগ- সহায়তা সময়মতো পৌঁছায় না, এটি পরিমাণে কম এবং অনেক প্রকৃত জেলে তালিকার বাইরে থেকে যান।

কুতুবদিয়ার জেলে মো. সাদেক বলেন, ‘বছরে তিন মাস সমুদ্রে যেতে পারি না। চাল পাই, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। তখন ঋণ করতে হয়।’

 উপকূলে সামাজিক প্রভাব

মাছ কমে যাওয়ার প্রভাব এখন উপকূলের সামাজিক কাঠামোয় দৃশ্যমান। দারিদ্র্য ও ঋণনির্ভরতা বাড়ছে। অনেক তরুণ জেলে পেশা বদল করছেন। কেউ শহরে গিয়ে শ্রমিকের কাজ করছেন, কেউ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন।

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জীবিকা অনিশ্চিত হলে সামাজিক অস্থিরতাও বাড়ে। সমুদ্রের সংকট এখন উপকূলের সামাজিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে জরুরি কয়েকটি পদক্ষেপ। উপকূলীয় এলাকায় শিল্প ট্রলার প্রবেশ কঠোরভাবে বন্ধ, স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও আধুনিক নজরদারি জোরদার, লাইসেন্স ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, ছোট ট্রলারের জেলেদের জন্য বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা, প্রজনন মৌসুমে পর্যাপ্ত ও সময়মতো সহায়তা এবং বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে টেকসই মৎস্যনীতি বাস্তবায়ন।

সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা অলি আহমেদ বলেন, ‘সমুদ্রকে সীমাহীন ভেবে ব্যবহার করলে চলবে না। বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে আহরণ সীমা নির্ধারণ ও কঠোর প্রয়োগ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।’

এইচ. এম. নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘কক্সবাজার উপকূলে শিল্প ট্রলার বনাম ছোট ট্রলারের জেলের দ্বন্দ্ব আসলে শক্তি ও দুর্বলতার দ্বন্দ্ব। সমুদ্র সবার হলেও সুযোগ সবার সমান নয়। এখনই যদি সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে ভবিষ্যতে সমুদ্র থাকবে। কিন্তু তার ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক জেলেদের জীবন হয়তো থাকবে না।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর