Saturday 21 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

অভিমানে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয়, অধ্যাপক রেজাউল হারুনের নীরব ঈদ

রাব্বী হাসান সবুজ ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২১ মার্চ ২০২৬ ১৯:০৩

অধ্যাপক রেজাউল হারুন।

রংপুর: রংপুরের বকসা গ্রামের বৃদ্ধাশ্রমে বই হাতে চুপচাপ বসে আছেন ৮২ বছরের প্রবীণ অধ্যাপক রেজাউল হারুন। একসময় যিনি ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীদের চোখে স্বপ্নের আলো জ্বালিয়ে দিতেন, আজ তিনি নিজেই সময়ের এক নিস্তব্ধ, হৃদয়বিদারক গল্প হয়ে উঠেছেন। ছেলের অবহেলা আর অপমান সহ্য করতে না পেরে ঢাকার নিজের ফ্ল্যাট ছেড়ে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন এই বৃদ্ধাশ্রমে। পরিবারহীন এই ঈদে তাঁর মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করছেন আশ্রমের কর্মীরা—যেন বার্ধক্যের এই শেষ প্রান্তেও তার চোখে এক ফোঁটা আলো জ্বলে।

জীবনের সোনালি অধ্যায়ে অধ্যাপক রেজাউল হারুন ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কুড়িগ্রামের চিলমারির প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। তিতুমীর কলেজ, মিরপুর বাংলা কলেজ ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কলেজে শিক্ষকতা করে শত শত ছাত্র-ছাত্রীর মনে জ্ঞানের বীজ বপন করেছেন। এক ছেলে আদনান ও এক মেয়েকে উচ্চশিক্ষিত করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ঢাকায় আলী আহমেদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে স্ত্রীর নামে একটি ফ্ল্যাটও কিনেছিলেন—স্বপ্নের নীড়। কিন্তু জীবনের হিসেব একদিন হঠাৎ বদলে গেল।

বিজ্ঞাপন

তিন বছর আগে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর দুর্বল হয়ে পড়েন তিনি। স্ত্রীও হার্টের রোগী, বিছানায়। সেই দুর্বলতার দিনে এক সকালে স্ত্রী বাজারে যেতে বললে তিনি ছেলেকে পাঠাতে চান। ছেলের উত্তর ছিল নির্মম—‘শুধু বসে বসে খেলে চলবে না, বাজারে যেতে হবে। তুমি বসে বসে খাবা।’ সেই কথা তাঁর সেন্টিমেন্টে গভীর ক্ষত তৈরি করে। মায়ের থাপ্পড়ের পরও ছেলে থামেনি। অভিমানে ভেঙে পড়ে সেদিনই বিকেলে বাসে উঠে সোজা রংপুর চলে আসেন। আর ফিরে যাননি ঢাকায়।

এক বছর ধরে তিনি রংপুরের বকসা বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। দিন কাটে বই-পত্রিকা পড়ে, অন্য প্রবীণদের সঙ্গে গল্প করে। ঈদের দিন এসব স্মৃতি মনে পড়বে কি না জানতে চাইলে দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘এসব আমি মেনে নিয়েছি। ছাত্রজীবনে ভূমিহীন কৃষকের বাড়িতে বাড়িতে থাকতাম। গরিব মানুষের ঘরেই আমার অভ্যাস। এখানে কিছু মনে হয় না।’ তাঁর এই সহজ মেনে নেওয়ার মধ্যেও লুকিয়ে আছে এক অসীম বেদনা—যে বেদনা হাজারো বাংলাদেশি বাবা-মায়ের।

২০২২ সালে সাবেক পুলিশ উপপরিদর্শক মো. রেজাউল করিমের ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই বৃদ্ধাশ্রমটি রংপুর শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে বকসা গ্রামে (ময়নাকুঠি, ৭ নং ওয়ার্ড) ৩১ শতক জমির ওপর অবস্থিত। বর্তমানে এখানে ২২ জন প্রবীণ মা-বাবা আশ্রয় নিয়েছেন—পরিবারের ‘বোঝা’ হয়ে যাওয়া সেইসব মানুষ, যারা একদিন সন্তানদের জন্য জীবন উজাড় করে দিয়েছিলেন। আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অনাথ আশ্রম ও মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রও।

প্রতিষ্ঠাতা রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি। এই ঈদে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করব—বাবাদের ঈদের মাঠে নিয়ে যাব, মাদের নতুন কাপড়ে সাজাব। যেন তাঁদের মুখে হাসি ফুটে থাকে। পরিবারের সঙ্গে ঈদ যেমন হওয়ার কথা ছিল, হয়তো তেমন হবে না। কিন্তু আমাদের ভালোবাসায় তাঁরা একা বোধ করবেন না।’

এই আশ্রম আজ দেশজুড়ে অবহেলিত বৃদ্ধদের শেষ আশ্রয় হয়ে উঠেছে। শহুরে জীবন, নিউক্লিয়ার পরিবার—সব মিলিয়ে অনেক বাবা-মা আজ একা। কিন্তু অধ্যাপক রেজাউল হারুনের মতো মানুষেরা এখনও বিশ্বাস করেন—ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না। এই ঈদে তাঁর জন্য শুধু একটি প্রার্থনা যেন বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা সেই পুরনো স্বপ্নগুলো আবার একটু আলো পায়।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর