সিলেট: ঈদের আনন্দ ও দীর্ঘ ছুটিতে পর্যটকদের পদচারণায় ভাসছে কাঞ্চনকন্যা খ্যাত সিলেট। সাদা পাথরের স্বচ্ছ জল, আর জাফলংয়ের মায়াবী ঝর্ণা আর সবুজ পাহাড়ের মিতালি উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে এসেছেন হাজার হাজার ভ্রমণ প্রিয় মানুষ।
ইট-পাথরের যান্ত্রিক শহর ছেড়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যে, সিলেটের চা-বাগানের ভাঁজে ভাঁজে আগত পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে ঈদ পরবর্তী দিনগুলোতে। কোথাও কোথাও মেঘালয় রাজ্যের সীমান্তের পাহাড়ের পাদদেশে বসে নির্মল প্রকৃতির অন্যান্য সৌন্দর্য উপভোগ করছেন সিলেটে আগত ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা।
বিশেষ করে সিলেটের সাদাপাথর, জাফলং, রাতারগুল, মায়াবী ঝর্ণা, বিছনাকান্দি, মালনীছড়া চা-বাগান, পান্তুমাই, লালাখাল, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগান, লাউয়াছড়া ও মাধবকুণ্ড। এই স্পটগুলোতে ঈদুল ফিতরের দিন থেকে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার পর্যটকদের সমাগম দেখা গেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিগত দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় মন্দাভাব ছিল পর্যটন ব্যবসায়। একদিকে ইরান যুদ্ধের প্রভাব, অন্যদিকে তেলের বাজারে সংকট, সবকিছু মিলিয়ে ভালো নেই সিলেটের পর্যটন ব্যবসায়। কিন্তু পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে ছুটিতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর আশা সিলেটের পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের।
তারা বলছেন, ঈদের মৌসুমে সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রায় দশ লাখ পর্যটকের সমাগম হতে পারে। এতে পর্যটন খাতে অন্তত ১৫০ কোটি থেকে ২০০ কোটি টাকার ব্যাবসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেটের কয়েকটি হোটেল রিসোর্টের কর্মকর্তার সাথে আলাপকালে জানা গেছে, সিলেটে পর্যটকের চাপ আরো কয়েকদিন অব্যাহত থাকবে। এখন পর্যন্ত বেশিরভাগ হোটেল, মোটেল ও রিসোর্ট ফুল বুকিং। আগামী সপ্তাহের জন্য অনেকে বুকিং কনফার্ম করেছেন।

সিলেটের মালনীছড়া চা-বাগানে ঘুরতে আসা নগরীর বায়েজিদ মাহমুদ বলেন, ‘রাতে সিলেটে এসে সকালে সাদাপাথর ঘুরে এসেছি, খুব ভালো লেগেছে, সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে সিলেটে একদিনে কয়েকটি স্পট একসাথে উপভোগ করা যায়।’
দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলার বন গোয়াইনঘাটের রাতারগুল। সেখানের স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পর্যটক বান্ধব সোনা মিয়া বলেন, ‘রমজানের শেষ সময়ের বৃষ্টিতে রাতারগুলের বনের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়েছে। বনের পরিবেশ পর্যটকদের মুগ্ধ করছে।’
তিনি বলেন, এবারের ঈদের বন্ধে পর্যটকদের উপস্থিতি ভালো। ঈদের দিন থেকেই পর্যটকরা আসা শুরু করছেন। রাতারগুলের তিনটি নৌকাঘাট মিলে ২০০ থেকে ২৫০টি নৌকা রয়েছে পর্যটকদের জন্য।
কোম্পানীগঞ্জ ফটোগ্রাফি সোসাইটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আনোয়ার হোসেন সুমন বলেন, “পর্যটকদের বরণ করতে সাদাপাথর পর্যটন কেন্দ্রের নৌকাঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে সাজ-সজ্জা করা হয়েছে। ঈদের দিন থেকে পর্যটকদের চাপে নৌকা সংকট হয়েছিল, মঙ্গলবার পর্যন্ত পর্যটকদের ভিড় লেগে আছে।”

ভোজন বিলাসী পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় স্থান পাওয়া সিলেটের ‘মেহমান রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদ আহমেদ জানান, পর্যটকরা হচ্ছে অতিথি পাখির মতো— তাদেরকে ভালো সার্ভিস দেওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। বরাবরের মতো মেহমান রেস্টুরেন্ট পর্যটকদের সু-স্বাস্থ্য খাবার পরিবেশন করাকে আমরা ইবাদত মনে করি। এবারের ঈদে লাখ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো শুধু ভ্রমণ পিপাসুদের আনন্দই দিচ্ছে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এদিকে, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও টুরিস্ট পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানিয়েছেন।
সিলেটে আগত পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কোনো ধরনের হয়রানি না হতে সোমবার জাফলং পরিদর্শন করেন প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান বিষয়ক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরি।

পর্যটকবাহী গাড়ি পার্কিং থেকে ৫০ টাকার পরিবর্তে ১২০ টাকা টোল আদায়ের বিষয়টি নজরে এনে ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। এ সময় পর্যটকদের কথা বলেন এবং অসুবিধার কথা শুনে ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বস্ত করেন।
তিনি বলেন, ‘সিলেট পর্যটকদের কাছে একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় গন্তব্য। আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে পর্যটকদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে সড়ক যোগাযোগ সচল রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
‘পর্যটকদের সুবিধার্থে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে টয়লেট, বিশ্রামাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হবে।’
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী জানান, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তায় উপজেলা প্রশাসন কাজ করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় পর্যটকদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারের ঈদেও পর্যটকদের নিরাপত্তায় থানা-পুলিশ, টুরিস্ট পুলিশ, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস ও আনসার, রোভার স্কাউটের সদস্যরা ও স্থানীয়রা ডুবুরিরা কাজ করছেন।
টুরিস্ট পুলিশ সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার উৎপল কুমার চৌধুরী জানান, ‘পর্যটন স্পটগুলোতে সার্বক্ষণিক টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কঠোর নজরদারি থাকবে।’