কক্সবাজার: কক্সবাজারের রামু উপজেলার মিঠাছড়ি গ্রামের সেই ছোট্ট ঘরটিতে একসময় ভেসে বেড়াতো দুটি শিশুর হাসি। সাত মাস বয়সী জমজ কন্যা রৌশনি ও রাফিজা। তাদের ঘিরেই ছিল মা মরিয়ম বেগমের পৃথিবী, বাবা আজিজুল হকের ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন।
কিন্তু ঈদের আনন্দে ভরা দিনগুলো যেন হঠাৎ করেই থেমে গেল তাদের জীবনে। উৎসবের রঙ না মুছতেই নেমে এলো অন্ধকার, হামের নির্মম থাবা।
তাদের স্বজনেরা জানান, ঈদের পরদিন থেকেই জ্বর আর কাশিতে কাবু হয়ে পড়ে দুই শিশু। প্রথমে সাধারণ অসুখ ভেবে স্থানীয় একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। মায়ের বুকের ভেতর তখনও ছিল আশা, ‘বাচ্চারা সেরে উঠবে’। কিন্তু দিন যত যায়, অসুখ ততই ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এক সপ্তাহ পর যখন হামের লক্ষণ স্পষ্ট হয়, তখন তাদের ছুটে যেতে হয় কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে। সেখানে শুরু হয় বাঁচিয়ে রাখার মরিয়া চেষ্টা। ডাক্তারের চিকিৎসা, বাবা-মায়ের নির্ঘুম রাত, আর প্রতিটি মুহূর্তে প্রার্থনা। কিন্তু সব প্রার্থনা যেন ব্যর্থ হয়ে যায়।
১৩ দিনের লড়াই শেষে প্রথমে থেমে যায় রৌশনির শ্বাস। পরিবারের কেউ তখনও পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। কারণ পাশে ছিল রাফিজা। কিন্তু ঠিক একদিন পর ১৫ দিনের মাথায়, সেও চলে যায় বোনের পথ ধরে। দুই দিনের ব্যবধানে নিভে যায় দুইটি প্রদীপ, স্তব্ধ হয়ে যায় একটি পরিবার।
বাবা আজিজুল হকের কণ্ঠে শুধু অসহায়তা। তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো চেষ্টা বাদ রাখিনি। প্রাইভেট হাসপাতালে নিয়েছি, পরে সদর হাসপাতালে ভর্তি করেছি। চট্টগ্রামেও নেওয়ার কথা ভেবেছিলাম… কিন্তু আর পারলাম না। শেষ পর্যন্ত দুই মেয়েকেই হারাতে হলো।’
তাদের প্রতিবেশীরা জানান, এই কান্না শুধু একজন বাবার নয়। এখন যেন পুরো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডজুড়ে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
প্রতিবেশী আমেনা বলেন, ‘তাদের ঘর ঢেকে গেছে বিষাদে। মা মরিয়ম বেগম এখনো মাঝে মাঝে দুই মেয়ের খাটের পাশে বসে থাকেন। ছোট্ট জামাগুলো গুছিয়ে রাখেন, খেলনাগুলো স্পর্শ করেন। হয়তো মনে মনে ভাবেন, এই বুঝি ওরা আবার ফিরে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা নিষ্ঠুর।’
এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের একই ওয়ার্ডে, একই রোগে আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলায় হামে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ জনে। করিডোরে কান্নার শব্দ, মায়েদের বুকভাঙা আহাজারি, আর বাবাদের নির্বাক দৃষ্টি। সব মিলিয়ে হাসপাতাল যেন পরিণত হয়েছে এক শোকের জনপদে।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শান্তনু ঘোষ জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫ শিশু ভর্তি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৪২ শিশু। চারটি মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হলেও আরও একটি মৃত্যু এখনো তালিকাভুক্ত হয়নি।
সংকট শুধু রোগে নয়, ব্যবস্থাপনাতেও
শিশু ওয়ার্ডে হামের জন্য আলাদা ইউনিট মাত্র ৮ শয্যার। বাস্তবে সেখানে জায়গা না থাকায় হামে আক্রান্ত ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের একই স্থানে রাখতে হচ্ছে। ফলে হামের সংক্রমণের ভয় আরও বাড়ছে।
চিকিৎসা নিতে আসা শিশুর অভিভাবক মো. সেলিম বলেন, ‘আমার বাচ্চা অন্য রোগে ভর্তি। কিন্তু পাশে হামের রোগী। কীভাবে নিশ্চিন্ত থাকব?’
এই পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপের আশ্বাস দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। তিনি বলেন, ‘সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত আইসোলেশন ব্যবস্থা চালু করা হবে।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও বলছে, ২০ শয্যার একটি ডেডিকেটেড আইসোলেশন ওয়ার্ড চালুর কাজ চলছে। তবে এর জন্য প্রয়োজন জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। যা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি উদ্যোগ নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। রোববার থেকে রামু ও মহেশখালীর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শুরু হচ্ছে হামের টিকাদান কর্মসূচি। ধীরে ধীরে এটি পুরো জেলায় বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর জানান, দেশের ১৮ জেলার ৩০টি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় কক্সবাজারের কয়েকটি ইউনিয়ন রয়েছে। প্রথম ধাপে রামুর দক্ষিণ মিঠাছড়ি এবং মহেশখালীর হোয়ানক ও বড় মহেশখালী ইউনিয়নে ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকার আওতায় আনা হবে।
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়, এই উদ্যোগ কি যথেষ্ট দ্রুত? রৌশনি ও রাফিজার মতো কত শিশু হারানোর পর আমরা পুরোপুরি সতর্ক হব?
তিনি আরো বলেন, হামের এই প্রাদুর্ভাব শুধু একটি রোগের গল্প নয়। এটি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, প্রস্তুতির ঘাটতি এবং সচেতনতার অভাবের নির্মম প্রতিচ্ছবি। আর সেই ঘাটতির সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে যাদের কিছু বলার ভাষাও নেই, সেই নিষ্পাপ শিশুরা।