সুনামগঞ্জ: টানা বৃষ্টিতে হাওরে জমে থাকা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে পাকা হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ধান, আর সেই ফসল বাঁচাতে বুকভরা কষ্ট নিয়ে কোমরসমান পানিতে নেমে কাঁচা ধান কাটছেন কৃষকরা। সুনামগঞ্জ জেলার হাওরাঞ্চলে এখন এটাই প্রতিদিনের বাস্তবতা—নৌকায় করে পানির নিচ থেকে ধান তুলে আনছেন কৃষকরা, তবে গোলাভর্তি ধানের স্বপ্ন ভেঙে যাচ্ছে চোখের সামনেই।
সোমবার (৬ এপ্রিল) দুপুরে সদর উপজেলার দেখার হাওরপাড়ের ইসলামপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া কাঁচা ধান কেটে নৌকায় তুলছেন কৃষকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাওরে জমে থাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ জমির আধাপাকা ধান পানির নিচে চলে গেছে। যে ফসল কিছুদিন পর ঘরে তোলার কথা ছিল, সেটিই এখন গবাদিপশুর খাবার হিসেবে কাটতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
ইসলামপুর গ্রামের কৃষক শাহআলম মিয়া বলেন, হাওরের পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। “বাঁধে সুইস গেইট না থাকায় বৃষ্টির পানি আটকে গিয়ে সব জমি তলিয়ে গেছে। যে ধান ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন গরুর খাবার হিসেবে কাটতে হচ্ছে,” বলেন তিনি। ধার-দেনা করে চাষ করা ফসল পানিতে নষ্ট হওয়ায় হতাশায় ভুগছেন কৃষকরা।
একই গ্রামের রশিদ মিয়া জানান, অনেক জমিতে গলা সমান পানি জমে আছে। “আর একটু বৃষ্টি হলেই সব শেষ হয়ে যাবে। চোখের সামনে ফসল ডুবে যাচ্ছে—চুপ করে থাকা যায় না, তাই কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছি,” বলেন তিনি। তার মতে, কিছু ধান গবাদিপশুর জন্য ব্যবহার করা হলেও কিছু ধান সিদ্ধ করে নিজেদের খাবারের জন্য রাখার চেষ্টা করছেন কৃষকরা।
কৃষকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই হাওরে একই ধরনের দুর্ভোগ তৈরি হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনা ও স্লুইস গেইট নির্মাণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন তারা।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে অন্তত ৩ হাজার ১৮৯ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক ফারুক আহমেদ বলেন, হাওরের অধিকাংশ এলাকায় ধান পাকার আগেই পানির নিচে চলে গেছে, ফলে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ধান কাটার মৌসুম পুরোদমে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি তা ব্যাহত করছে।
জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী মৌসুমে সার ও বীজ সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি হাওরের ফসল রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে স্লুইস গেইটসহ পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।