Wednesday 15 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চরের বুকে সেই চার তারকা রিসোর্ট, নদীগর্ভে বিলীন এক সম্ভাবনার গল্প

তাসলিমুল হাসান সিয়াম, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৬:৫৯ | আপডেট: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:০২

ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা সেই চরের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

গাইবান্ধা: ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা চর একসময় সাক্ষী হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী আয়োজনের—গ্রামীণ সৌন্দর্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা চার তারকা মানের ‘গ্রামীণ রিসোর্ট’। পরে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া সেই উদ্যোগ এখন স্মৃতির পাতায় কেবল সম্ভাবনার এক গল্প হয়ে আছে।

বর্ষায় ভয়াল আর শুষ্ক মৌসুমে রুক্ষ-শান্ত এই চরই ২০১০ সালে রূপ নিয়েছিল এক স্বপ্নগ্রামে। থাইল্যান্ডের রাজকন্যা মাহা চাকরির আগমন উপলক্ষ্যে গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের রসুলপুরে বালুচরের ওপর পলিমাটি ফেলে, সবুজ ঘাস বিছিয়ে ও ফুলের বাগানে সাজিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল এই আয়োজন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চার তারকা মানের সুবিধাসম্পন্ন ওই রিসোর্ট তৈরিতে রসুলপুর চরের প্রায় ৩০ বিঘা জমি এক বছরের জন্য ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বিঘাপ্রতি জমির মালিক ২ হাজার টাকা করে ভাড়া পান।

রিসোর্ট এলাকায় ছিল ৩৫টি কুঁড়েঘর, মাঝখানে গোল বৈঠকখানা, পাশেই রান্নাঘর, পিঠাঘর ও হস্তশিল্পের ঘর। খেজুর পাতার নকশি পাটি, হারিকেনের আলো ও শিকায় ঝুলে থাকা কারুশিল্প মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল এক সাংস্কৃতিক আবহ।

বিভিন্ন ঘরে ছিল বাঁশের তৈরি নান্দনিক আসবাব, আধুনিক টয়লেট ও বেসিন, এমনকি ঝরনাসহ গোসলখানার ব্যবস্থাও। পুরো প্রকল্পে গ্রামীণ ঐতিহ্য ও আধুনিক সুবিধার সমন্বয় ঘটানো হয়েছিল, যা তখনকার সময়ের জন্য ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয় ঢাকার ‘সিন অফ সিন’ প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে এবং চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল পরিকল্পনায়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত কুটিরশিল্পীরা এতে অংশ নেন। বিদ্যুৎ সরবরাহে ব্যবহার করা হয়েছিল ২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জেনারেটর এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।

তবে সেই উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে রিসোর্টটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে ওই এলাকায় চাষ হচ্ছে ভুট্টা।

চর বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মপুত্রের চরগুলো পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা গেলে তা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ‘ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র’ হয়ে উঠতে পারে। এতে স্থানীয়দের কর্মসংস্থান, কুটিরশিল্প ও লোকসংস্কৃতির বিকাশ ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নদীভাঙন, ভৌগোলিক অস্থিরতা, যোগাযোগের দুর্বলতা ও বিনিয়োগ সংকট বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

তাদের মতে, টেকসই পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় ছাড়া এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া কঠিন।

থাই রাজকন্যার সেই সফর ছিল স্বল্পস্থায়ী, কিন্তু তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। এটি দেখিয়ে দিয়েছিল, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে ব্রহ্মপুত্রের চরও হতে পারে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র।

আজ নতুন করে ভাবার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা—কারণ একদিন যে চরে রাজকীয় আয়োজন সম্ভব হয়েছিল, সেই চরই ভবিষ্যতের পর্যটনের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর