Friday 15 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দুশ্চিন্তায় সিরাজগঞ্জের কৃষকরা
চিটা-ব্লাস্ট-পোকার আক্রমণে হেক্টরের পর হেক্টর জমির ধান নষ্ট

আশরাফুল ইসলাম জয়, ডিস্টিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৫ মে ২০২৬ ০৮:০৩

সিরাজগঞ্জ: জেলায় চলতি বোরো মৌসুমে ব্রি ধান-২৮ আবাদ করে চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক। মাঠজুড়ে ধান পেকে সোনালি রঙ ধারণ করলেও অধিকাংশ শীষে মিলছে না দানা। কোথাও চিটা, কোথাও ব্লাস্ট রোগ, আবার কোথাও পোকামাকড়ের আক্রমণে শুকিয়ে যাচ্ছে ধানের শীষ। জেলার ৯টি উপজেলাজুড়েই এমন পরিস্থিতিতে কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও উদ্বেগ।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চাষ হওয়া ৫৬ বছর পুরোনো ব্রি ধান-২৮ জাতটি বর্তমানে নেক ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়েছে। আবহাওয়া ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণেও এবার রোগের প্রকোপ বেড়েছে।

জেলার সদর, কামারখন্দ, উল্লাপাড়া, শাহজাদপুর, কাজিপুর, বেলকুচি, রায়গঞ্জ, তাড়াশ ও চৌহালী উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠে এখন পাকা ধানের মৌসুম। দূর থেকে খেতগুলো দেখতে সোনালি ফসলের সমারোহ মনে হলেও কাছাকাছি গেলে ফুটে উঠছে ভিন্ন চিত্র। অধিকাংশ ক্ষেতেই শীষে দানা নেই, কোথাও আবার শীষ কালচে হয়ে শুকিয়ে গেছে। কৃষকদের দাবি, এমন রোগ তারা আগে কখনও দেখেননি তারা।

বিজ্ঞাপন

জেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, অনেক কৃষক এখন আগেভাগেই ধান কেটে ফেলছেন। কারণ দেরি হলে পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ধানের পূর্ণ পরিপক্বতা না হওয়ায় ফলন আরও কমে যাচ্ছে। খড়ের পরিমাণ থাকলেও শীষে দানা না থাকায় কৃষকদের হতাশা বাড়ছে।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে সিরাজগঞ্জে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার ৮০০ একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন। তবে ব্লাস্ট ও চিটা রোগের কারণে অনেক এলাকায় ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সদর উপজেলার খোকশাবাড়ী এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, ‘১২ বিঘা জমিতে ব্রি ধান-২৮ আবাদ করেছি। শুরুতে ধান খুব ভালো ছিল। কিন্তু শীষ বের হওয়ার পর থেকেই শুকাতে শুরু করে। এখন দেখি অধিকাংশ ধান চিটা। খরচই উঠবে না।’

উল্লাপাড়ার বড়হর ইউনিয়নের কৃষক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা খরচ করেছি। সার, কীটনাশক, সেচ সব ঠিকমতো দিয়েছি। কিন্তু এখন ধান কাটতে গিয়ে দেখি শীষে দানা নেই। কৃষক বাঁচবে কীভাবে?’

কাজিপুর উপজেলার কৃষক মফিজুল ইসলাম জানান, ধানের গাছ ভালো ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে শীষের গোড়া কালো হয়ে শুকিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষি অফিস থেকে এটি ব্লাস্ট রোগ বলে জানানো হলেও ওষুধ প্রয়োগে কোনো কাজ হয়নি বলে দাবি তার।

শাহজাদপুর উপজেলার কৃষক আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘এবার ফলনের আশা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে লোকসান ছাড়া কিছুই হবে না। ঋণ করে চাষ করেছি, সেই টাকা কীভাবে পরিশোধ করবো বুঝতে পারছি না।’

কৃষকদের অভিযোগ, মাঠ পর্যায়ে সময়মতো রোগ শনাক্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। অনেকেই প্রথমে এটিকে সাধারণ পোকার আক্রমণ ভেবেছিলেন। পরে ধীরে ধীরে পুরো খেতেই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাজার থেকে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করেও মিলছে না প্রতিকার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে একই জাতের ধান আবাদ হওয়ায় এর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে ব্লাস্ট রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

এবিষয়ে সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা বলেন, ‘ব্রি ধান-২৮ অত্যন্ত পুরোনো একটি জাত। বর্তমানে এটি নেক ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকটাই হারিয়েছে। এবার আবহাওয়া রোগ বিস্তারের অনুকূলে থাকায় এর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের ব্রি ধান-২৮ এর পরিবর্তে নতুন ও রোগ সহনশীল জাত আবাদে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সচেতনতামূলক পরামর্শ, লিফলেট বিতরণ ও নিয়মিত মনিটরিং কার্যক্রম চলছে।’

তবে কৃষকদের দাবি, শুধু পরামর্শ নয়, এখন প্রয়োজন বাস্তব সহায়তা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, স্বল্পমূল্যে বীজ সরবরাহ ও সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা না হলে তারা বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে পড়বেন।

স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখনই বিকল্প উচ্চফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী ধানের জাত সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। পাশাপাশি কৃষকদের আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা, রোগ শনাক্তকরণ ও সঠিক সময়ে প্রতিকার বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাড়ানো জরুরি।

তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কৃষিতে দ্রুত অভিযোজন না আনলে ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় আরও বাড়তে পারে। এজন্য গবেষণাভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ, ক্ষতিপূরণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। অন্যথায় সিরাজগঞ্জের কৃষি অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর