নীলফামারী: চলতি বোরো মৌসুমে নীলফামারীতে ধানের বাম্পার ফলন হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানে পড়েছেন কৃষকরা। উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে ধানের দাম না বাড়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা। অনেক কৃষক ভবিষ্যতে ধানের পরিবর্তে লাভজনক অন্য ফসল চাষের ঝুঁকছেন।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখন ধান কাটার ব্যস্ততা চলছে। মাঠজুড়ে সোনালি ধানের শীষে ভরে উঠলেও কৃষকের মুখে নেই স্বস্তির হাসি। কারণ বাজারে ধানের দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে নীলফামারীতে ৮১ হাজার ৮৫৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৯০১ মেট্রিক টন চাল। ইতোমধ্যে প্রায় ১৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে।
সদর উপজেলার চওড়া বড়গাছা গ্রামের কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘দেশে নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও কৃষিপণ্যের দাম বাড়ছে না।’ তিনি জানান, এবার আলু চাষেও লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন ধানের বাজারও ভেঙে পড়ায় কৃষকরা আরও বিপাকে পড়েছেন।
একই উপজেলার কিসামত ভুটিয়ান এলাকার কৃষক আব্দুল জলিল বলেন, দুই বিঘা জমিতে ধান চাষে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও বিক্রি করে পাওয়া যাবে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এ অবস্থায় আগামীতে ধানের বদলে ভুট্টা চাষের পরিকল্পনা করছেন তিনি।
কৃষকদের মতে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ধান পাওয়া যাচ্ছে। তবে সার, সেচ, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেক বেড়েছে। শুধু সেচ বাবদই এক বিঘা জমিতে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এর সঙ্গে মাড়াই ও পরিবহন খরচও যোগ হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন হাট-বাজারে দেখা গেছে, ধানের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। মীরগঞ্জ হাটে এক সপ্তাহ আগেও প্রতি মণ হাইব্রিড ধান বিক্রি হয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকায়। বর্তমানে সেই ধান বিক্রি হচ্ছে ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায়। কৃষকদের অভিযোগ, এ দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। সংসারের খরচ ও ঋণের চাপ সামলাতে বাধ্য হয়েই তারা কম দামে ধান বিক্রি করছেন।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে বাজারে ধানের অতিরিক্ত সরবরাহ এবং সরকারি ক্রয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু না হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। ফলে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
নীলফামারী সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আতিক হাসান বলেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হয়েছে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম ছিল। চলতি মাসের মধ্যেই জেলার অধিকাংশ ধান কাটা শেষ হবে বলে আশা করছেন তিনি।
নীলফামারী কৃষি বিপণন কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম বলেন, বাজারে ধানের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কিছুটা কমেছে। তবে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষকদের সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রির জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মনজুর রহমান বলেন, সরকার নির্ধারিত দামে ধান সংগ্রহ শুরু হলে বাজারদর স্থিতিশীল হবে। কৃষকদের সহায়তায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় ৭৮টি কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন কাজ করছে।
কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না হলে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই দ্রুত সরকারি ক্রয় কার্যক্রম জোরদার, কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহ এবং কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।