Sunday 24 May 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

বড়লেখায় জোড়া খুন
খুনিরা প্রকাশ্যে, ভিটেমাটি ছাড়া ভুক্তভোগী পরিবার

জুলফিকার তাজুল ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৪ মে ২০২৬ ১০:০৫

মৌলভীবাজারের বড়লেখায় খুনের শিকার প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও তার ভাই কৃষক আব্দুল কাইয়ুম। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

মৌলভীবাজার: বড়লেখার বিওসি কেছরীগুল এলাকা। সেখানেই পাঁচ মাস আগে দুর্বৃত্তের হাতে খুন হন দুই ভাই। বর্তমানে তাদের ঘরের মূল ফটকে ঝুলছে মস্ত বড় তালা। নেই কোনো জনমানব; ভেতরে বিরাজ করছে ভুতুরে পরিবেশ। যে বাড়িটি পাঁচ মাস আগেও প্রবাসী এক ভাইয়ের ঘরে ফেরার আনন্দে মুখরিত ছিল, সেখানে আজ শুধুই সুনশান নীরবতা।

গত বছরের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশ্য দিবালোকে খুন হন কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন ও তার ভাই কৃষক আব্দুল কাইয়ুম। সেই হিসাবে তাদের হত্যার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত মামলার নেই কোনো অগ্রগতি। বরং, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে হুমকি দিচ্ছে। ফলে নিজেদের পৈত্রিক ভিটেমাটি ছেড়ে ফেরারি অসহায় পরিবারটি। অথচ, যাদের নামে সুনির্দিষ্ট খুনের মামলা, পুলিশের নাকের ডগায় তারা রয়েছে বহাল তবিয়তে। আইনের এমন উলটো রথ আর প্রশাসনের নীরবতায় পুরো বড়লেখা জুড়ে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

প্রশ্ন উঠেছে আইন-শৃঙ্খলারক্ষা বাহিনীর চরম অবহেলা, রহস্যজনক নিষ্ক্রিয়তা আর অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে কি তবে জিম্মি হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবন? সরেজমিনে বড়লেখা উপজেলার বিওসি কেছরীগুল (মাঠগুদাম) এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ভুক্তিভোগীর বাড়িতে ভুতুড়ে পরিবেশ। যে বাড়িটি পাঁচ মাস আগেও মানুষের আনাগোনায় মুখরিত ছিল, সেই বাড়ির মূল ফটকে এখন ঝুলছে তালা। ভুক্তভোগী পরিবারটি আজ নিজেদের শেষ আশ্রয়টুকুতেও মাথা গোঁজার সাহস পাচ্ছে না।

জানা গেছে, কুয়েত প্রবাসী জামাল উদ্দিন দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষ করে মাত্র কয়েক মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। এসেই ভাইসহ খুনের শিকার হন তিনি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই একটি গ্রুপ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল ও হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বিভিন্ন সময় স্থানীয় প্রশাসনের দ্বারস্থ হলেও দৃশ্যমান কোনো ফল মেলেনি।

এরই চূড়ান্ত নির্মম রূপ নেয় গত ২৭ ডিসেম্বর বিকেলে। বিওসি মাঠগুদাম এলাকায় পূর্বশত্রুতার জের ধরে দুই পক্ষের বাকবিতণ্ডার এক পর্যায়ে প্রতিপক্ষ ধারাল রামদা ও লাঠিসোটা নিয়ে দুই ভাইয়ের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায়। এতে জামাল ও কাইয়ুম ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। একই ঘটনায় অপরপক্ষের জমির উদ্দিন নামের একজন আহত হলে তাকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জামালের পরিবারে পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। কিন্তু আজ তাদের স্ত্রী-সন্তানরা স্বজন হারিয়ে চরম ভয়, আতঙ্ক আর মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিহত জামাল উদ্দিনের স্ত্রী হালিমা বেগম অশ্রুভেজা চোখে এবং আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে মানুষগুলো নৃশংসভাবে খুন হলো। অথচ, খুনিরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আমাদের ঘরছাড়া করে রেখেছে। আজ জীবন বাঁচাতে আমরাই ফেরারি।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিহত জামাল উদ্দিন অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি জীবনের অর্ধেক সময় প্রবাসে কাটিয়েছেন। শেষ সময় দেশে এসেছিলেন পরিবারের সঙ্গে থাকতে। কিন্তু তাকেও সন্ত্রাসীদের হাতে নির্মমভাবে খুন হতে হলো। তার অভাব একমাত্র তার পরিবার ছাড়া কেউ বুঝবে না।’

নিহত জামাল উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এক নারী সারাবাংলাকে বলেন, ‘তাদের বাড়িতে বেড়াতে গেলে হালিমা বেগম আমাদের কতটা মায়া করতেন, কত রান্না করে খাওয়াতেন! আজ তার স্বামী নেই, মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। আমরা কার কাছে বিচার চাইব? এই দেশে কি সাধারণ মানুষের জন্য কোনো আইন নেই?’

১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা, ১৩ জনই জামায়াতের নেতা-কর্মী

অনুসন্ধানে জানা যায়, বিওসি কেছরীগুল এলাকায় সংঘটিত এই সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বড়লেখা থানায় মোট ১৬ জনকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছিল। মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, আসামিদের মধ্যে ১৩ জনই স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মী এবং বাকি তিন জন অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য।

প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ফুঁসছে বড়লেখা

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচন শেষ হলেও চাঞ্চল্যকর এই জোড়া খুনের মামলার আসামিদের গ্রেফতারে বড়লেখা থানা ও স্থানীয় সিভিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো জবাবদিহিতা বা দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। মামলার পর দীর্ঘ পাঁচ মাস অতিবাহিত হলেও প্রধান আসামিসহ ১৪ জনের একজনকেও ধরতে না পারা পুলিশের চরম অবহেলা, উদাসীনতা এবং পরোক্ষ পক্ষপাতিত্বকেই নির্দেশ করে। প্রশাসনের এমন রহস্যজনক নীরবতা এবং আসামিদের ক্ষমতার দাপটের কারণে পুরো বড়লেখা জুড়ে সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এলাকার সাধারণ মানুষ এখন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কিত।

থানা পুলিশের দাবি ও বাস্তবতা

মামলার দীর্ঘ স্থবিরতা ও আসামিদের গ্রেফতার না হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বড়লেখা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান খান সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিহত দু’জন আপন দুই ভাই ছিলেন। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদের মাথায় আঘাত করা হয়েছিল এবং আমরা তাদের ঘটনাস্থলেই মৃত অবস্থায় পাই। ঘটনার পর থেকেই পুলিশ প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের গ্রেফতারে কাজ করছে। আসামিদের গ্রেফতারে আমাদের বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’

দীর্ঘ পাঁচ মাসেও কেন একজন আসামিকে গ্রেফতার করা হলো না? কিংবা আসামিরা এলাকায় থাকা সত্ত্বেও কেন পুলিশ তাদের ধরছে না?— এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেননি ওসি মনিরুজ্জামান। তার দাবি ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ লক্ষ্য করা গেছে।

দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার দাবি

নিজেদের ঘরবাড়ি হারিয়ে, স্বজনদের হারিয়ে আজ ধুঁকে ধুঁকে মরছে অসহায় দুই পরিবার। স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় বা কোনো বিশেষ দলের কোটা ব্যবহার করে কেউ যেন পার পেয়ে যেতে না পারে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক অবহেলার এই বিষাক্ত বেড়াজাল ছিন্ন করে অবিলম্বে এজাহারভুক্ত বাকি ১৪ আসামিকে দ্রুততম সময়ে গ্রেফতার করতে হবে।

ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটিকে তাদের পৈত্রিক ভিটেমাটিতে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা এবং বর্বরোচিত এই জোড়া খুনের মামলা দ্রুততম ট্রায়ালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি নিশ্চিতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বড়লেখার নাগরিক সমাজ।

বিজ্ঞাপন

আরো

জুলফিকার তাজুল - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর