Monday 08 Jun 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রংপুরে তাপপ্রবাহ / শ্রমজীবীদের দুর্ভোগ, তালশাঁস-হাতপাখায় স্বস্তির খোঁজ

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৮ জুন ২০২৬ ১৫:২০ | আপডেট: ৮ জুন ২০২৬ ১৫:২২

তীব্র গরমে গোসল করছে এক শিশু

রংপুর: ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই তীব্র তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস করছে রংপুর অঞ্চল। প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামলেও প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে পড়ছেন তারা। মাঠ-ঘাট ছেড়ে অনেককে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতে দেখা যাচ্ছে।

গতকাল রোববার (৭ জুন) দুপুর ১২টায় রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বিভাগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ সোমবারও (৮ জুন) রংপুর বিভাগের তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস।

বিজ্ঞাপন

‘পেটের দায়ে বাইর হইলেও গরমে কাহিল করি ফেলাইচে’

তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক বজলুল হক বলেন, ‘ঈদের পর ২ টাকা বেশি কামাই করমু, তারও উপায় নাই। পেটের দায়ে রিকশা ধরি বাইর হইলেও গরমে হামাক কাহিল করি ফেলাইচে। এত রইদোত কি রিকশা চলা যায়!’

রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুপুরের রোদে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। শহরের বিভিন্ন স্থানে রিকশাচালকদের গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষি ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বোরো মৌসুমে গরমের জ্বালা, দুপুরের আগেই কাজ গুটিয়ে নিচ্ছেন কৃষকরা

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৮টি উপজেলা ও মেট্রো এলাকা মিলিয়ে এ বছর প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বোরো ধান কাটার মৌসুম চললেও প্রচণ্ড গরমে অনেক কৃষিশ্রমিক দুপুর হওয়ার আগেই কাজ গুটিয়ে নিচ্ছেন।

শহরতলির খটখটিয়া এলাকায় ধান মাড়াইয়ের কাজ করতে গিয়ে কিছুক্ষণ পরই গাছতলায় আশ্রয় নেন কয়েক শ্রমিক। তাদের একজন ষাটোর্ধ্ব জমির আলী বলেন, ‘এই রইদোত জমিত একদণ্ড থাকা যায় না। গরমোত গাও সিদ্ধ হয়া গেইচে বাহে। না খ্যায়া থাকলেও কাম করার শক্তি নাই।’

প্রচণ্ড রোদের কারণে মাঠের কাজের সময়সূচি বদলে গেছে। কৃষক ও শ্রমিকরা ভোর ও সন্ধ্যার দিকে কাজ করে দুপুরের সময়টুকু বিশ্রামে কাটাচ্ছেন।

বিদ্যুৎ না থাকায় হাতপাখায় ভরসা, তালশাঁসের বিক্রি বেড়েছে

তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। ফলে শহর জুড়ে বেড়েছে হাতপাখার চাহিদা। ফুটপাতে তালপাখা, বাঁশ, কাপড় ও সুতা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েক দিন আগেও ১০ টাকার পাখা বিক্রি হতো, এখন তা ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাচারিবাজার এলাকায় হাতপাখা কিনতে আসা লাইলি বেগম বলেন, ‘কদিন ধরে খুব গরম পড়ছে, বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। হাতপাখা ছাড়া উপায় কী?’

তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তালশাঁসের চাহিদা। গরমে স্বস্তি পেতে নগরীর সুরভী উদ্যান, কাচারিবাজার, ওরিয়েন্টাল সিনেমা হলের গলিসহ বিভিন্ন স্থানে ভিড় করছেন ক্রেতারা। সেখানে জমে উঠেছে তালশাঁসের হাট।

খুচরা বিক্রেতা হামিদুল ইসলাম জানান, একটা তালে তিনটা বিচি থাকে, প্রতিটা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর ব্যবসা খুব ভালো। পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, রংপুরে বাণিজ্যিকভাবে তালের চাষ না থাকায় বাগেরহাট থেকে ট্রাকে তাল আনতে হয়। তীব্র গরমের কারণে এবার চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে, প্রতিদিন অন্তত পাঁচ ট্রাক তাল রংপুরে আসছে।

বাড়ছে হিটস্ট্রোক-ডায়রিয়ার ঝুঁকি

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমান আবহাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

চিকিৎসকরা বেশি করে পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সময়টুকু সম্ভব হলে ঘরের ভেতরেই কাটানোর পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দুই দিন ধরে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আপাতত গরম থেকে স্বস্তির কোনো আভাস নেই। ফলে রোদ, ঘাম আর বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে দিন পার করছেন রংপুরের মানুষ।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। মাঠ-ঘাট ছেড়ে তারা এখন ছায়াঘেরা গাছতলাতেই খুঁজছেন সামান্য স্বস্তি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর