কুমিল্লা: দেশের কৃষিতে প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। প্রচলিত ধান, সবজি ও ফলচাষের গণ্ডি পেরিয়ে এবার কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে আঙ্গুর চাষ করে সফলতার নজির স্থাপন করেছেন স্থানীয় কৃষি উদ্যোক্তা আক্তারুজ্জামান সেকুল।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার আদর্শ সদর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম শরীফপুর। চারদিকে সবুজ ফসলের মাঠের মাঝখানে হঠাৎ চোখে পড়বে ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য। মাত্র ১০ মাসের ব্যবধানে গাছে এসেছে বাণিজ্যিক ফলন। লাল-কালো রঙের উন্নত জাতের আঙ্গুরে ভরে উঠেছে পুরো বাগান। দূর থেকে দেখলে মনে হবে দেশের কোনো আঙ্গুর বাগান নয়, যেন বিদেশের কোনো ফলের খামার।

এই বাগানের উদ্যোক্তা কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল। কৃষিতে নতুন কিছু করার স্বপ্ন থেকেই তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ফলের চাষাবাদ নিয়ে গবেষণা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পরে ভারতে গিয়ে আঙ্গুর চাষের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে নিজ গ্রামের ৮২ শতক জমিতে শুরু করেন বাণিজ্যিকভাবে আঙ্গুর চাষ।
তিনি বাগানে বাইনুকুর, রাশিয়ান ভ্যারাইটি এবং তুরস্কের সিডলেস জাতের আঙ্গুরের চারা রোপণ করেন। শুরুতে অনেকেই তার এই উদ্যোগকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করলেও বর্তমানে সফল ফলনের কারণে বাগানটি এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আক্তারুজ্জামান সেকুল বলেন, ‘অনেক দিন ধরেই দেশে নতুন কোনো ফলের চাষ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা ছিল। বিভিন্ন দেশে আঙ্গুর চাষের সফলতা দেখে এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে বুঝতে পারি, আমাদের আবহাওয়াতেও এটি সম্ভব। এরপর সাহস করে বাগান শুরু করি। শুরুতে কিছুটা শঙ্কা থাকলেও নিয়মিত পরিচর্যা, সেচ ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভালো ফলন পেয়েছি।’
তিনি জানান, রোপণের মাত্র ১০ মাসের মাথায় গাছে ফল আসতে শুরু করেছে। গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে প্রথম দিকে অনেক ফলের কলি কেটে ফেলতে হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২০০টি থোকা সংরক্ষণ করা হয়েছে, যার প্রতিটির ওজন প্রায় আধা কেজি। সব মিলিয়ে বাগানে এখন প্রায় ১০০ কেজি আঙ্গুর রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘যদি বাজারজাতকরণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া যায়, তাহলে আরও বড় পরিসরে আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণ করতে চাই। আমার ইচ্ছা, এলাকার অন্য কৃষকরাও এই চাষে উদ্বুদ্ধ হোক।’
বাগানটি দেখতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার মানুষ। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আঙ্গুরের স্বাদ নিচ্ছেন, আবার কেউ উদ্যোক্তার কাছ থেকে চাষাবাদের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জানছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আঙ্গুর বাগান দেখেছি, কিন্তু কুমিল্লায় এমন বাগান দেখব কখনও ভাবিনি। গাছে ঝুলে থাকা আঙ্গুর দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। এটি প্রমাণ করে, সঠিক উদ্যোগ ও পরিশ্রম থাকলে আমাদের কৃষকরাও নতুন নতুন ফসল উৎপাদনে সফল হতে পারেন।’
দর্শনার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘বাগানটি দেখতে অনেক সুন্দর। পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখতে এসেছি। আঙ্গুরগুলো যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি স্বাদেও বেশ ভালো। এমন উদ্যোগ অন্যদেরও উৎসাহিত করবে।’

শুধু সাধারণ মানুষই নন, বাগানটি নিয়মিত পরিদর্শন করছেন কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারাও। তারা ফলনের অবস্থা, গাছের বৃদ্ধি এবং রোগবালাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবী ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান রহমান বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে আমরা যে ফলন দেখছি, তা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়েছে এবং ফলের মানও সন্তোষজনক। কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকার মাটি ও আবহাওয়া আঙ্গুর চাষের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষকদের উচ্চমূল্যের ফল চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আঙ্গুরের মতো নতুন ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষিতে নতুন বৈচিত্র্য আসবে।’

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কুমিল্লার সীমান্তবর্তী জনপদে ছোট ছোট টিলা, উঁচু জমি ও দীর্ঘদিন ধরে অনাবাদি পড়ে থাকা অনেক জমি রয়েছে। এসব এলাকায় পরিকল্পিতভাবে আঙ্গুর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, কৃষকদের আয় বাড়বে এবং দেশের ফল উৎপাদনে যুক্ত হবে নতুন সম্ভাবনা।