যশোর: ঢাকায় আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় শিশুর মৃত্যুর ঘটনার রেশ না কাটতেই এবার যশোরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় এক রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জ্বর, ঠান্ডা ও কাশি নিয়ে যশোরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ইমরান হোসেনের মৃত্যুর পর এ অভিযোগ ওঠে।
মারা যাওয়া রোগী ইমরান হোসেন শার্শার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের গাজীপাড়া গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী।
স্বজনদের অভিযোগ, পরপর কয়েকটি ইনজেকশন দেওয়ার পরই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে তার মৃত্যু হয়। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ইমরানের ৭ মাস বয়সী এক ছেলে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের আকস্মিক মৃত্যুতে স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর রোগীর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। বরং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় গাফিলতি, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ছাড়াই ওষুধ ও ইনজেকশন প্রয়োগ এবং রোগীর অবস্থা খারাপ হলেও গুরুত্ব না দেওয়ার কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে।
নিহতের খালাতো ভাই ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘ভাইকে হাসপাতালে ভর্তি করার পর কয়েকটি পরীক্ষা দেওয়া হয়। আমাদের বলা হয়েছিল রাত ৯টার দিকে রিপোর্ট পাওয়া যাবে। এরপর একজন সেবিকা কিছু ওষুধের তালিকা দেন। আমরা হাসপাতালের ফার্মেসি ও বাইরের দোকান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করি। কিন্তু রোগীর মূল সমস্যা ছিল শ্বাসকষ্ট। আমরা ভেবেছিলাম তাকে দ্রুত অক্সিজেন দেওয়া হবে। তার পরিবর্তে একের পর এক ইনজেকশন দেওয়া হয়।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রথম ইনজেকশন দেওয়ার পর থেকেই ইমরান অস্বস্তি অনুভব করতে থাকেন। তিনি চিকিৎসাকর্মীদের কাছে কষ্টের কথা জানান এবং পরবর্তী ইনজেকশন না দেওয়ার অনুরোধও করেন। কিন্তু এরপরও তাকে আরও ইনজেকশন দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম ইনজেকশনের পর ভাই বারবার বলছিল, তার খুব কষ্ট হচ্ছে। দ্বিতীয় ইনজেকশনের পর তার মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। এরপর তৃতীয় ইনজেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণ পর সে প্রস্রাব করে দেয় এবং নিস্তেজ হয়ে পড়ে। তখনই আমরা বুঝতে পারি বড় ধরনের কিছু ঘটেছে।’
স্বজনদের আরও দাবি, রোগীর অবস্থার দ্রুত অবনতি হলেও চিকিৎসকরা তা গুরুত্ব সহকারে নেননি। পরে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ইমরান তখনই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু বিষয়টি আড়াল করার জন্য তাকে কিছু সময় আইসিইউতে রাখা হয় এবং পরে মৃত্যুর ঘোষণা দেওয়া হয়।
এদিকে নিহতের বাবা শওকত আলী বিশ্বাস যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে তার ছেলে ইমরানকে চিকিৎসার জন্য আদ্-দ্বীন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক কোনো ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই স্যালাইনের সঙ্গে এবং হাতে লাগানো ক্যানোলার মাধ্যমে একাধিক ইনজেকশন প্রয়োগ করেন।
অভিযোগপত্রে তিনি লেখেন, ইনজেকশন দেওয়ার পরপরই তার ছেলে চিৎকার করতে শুরু করেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই মারা যান। এরপর মৃত অবস্থায় তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিবারের সদস্যদের কাছে এসে মৃত্যুর খবর জানায়। ভুল চিকিৎসার কারণেই তার ছেলের মৃত্যু হয়েছে। তিনি ঘটনার তদন্তপূর্বক দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক ডা. ইমদাদুল হক চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,‘নিয়ম অনুযায়ী ইমার্জেন্সিতে ইমরানকে দেখা হয়েছে। এরপর তাকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও দেখেছেন। রোগীকে প্রাথমিকভাবে গ্যাস ও বমির চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। এটি একটি স্বাভাবিক মৃত্যু।’
ঘটনার পর হাসপাতাল চত্বরে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। নিহতের স্বজন, প্রতিবেশী এবং স্থানীয় শত শত মানুষ হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। তারা চিকিৎসকদের উপস্থিত করে ঘটনার ব্যাখ্যা দাবি করেন এবং চিকিৎসা অবহেলার বিচার চান।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
এ বিষয়ে কোতোয়ালি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুম খান বলেন, প‘রিস্থিতি বর্তমানে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশের একাধিক টিম বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।’