Sunday 28 June 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

রাজশাহীতে বাড়ছে এইডস আক্রান্তের সংখ্যা, ৬৬ শতাংশই সমকামী

শামীম সবুজ, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২৮ জুন ২০২৬ ০৮:০৮

এইডস আক্রান্ত রোগী। ফাইল ছবি

রাজশাহী: রাজশাহীতে বেড়েছে এইচআইভি ভাইরাসের প্রকোপ। এ পর্যন্ত এইচআইভি ভাইরাসে শনাক্ত হয়েছেন ১৩৯ জন, যার সিংহভাগই সমকামী। অন্যদিকে অফলাইনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়ে সমকামিতা প্রমোটে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে একটি চক্র। ফলে উচ্চ ঝুঁকিতে সমকামীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমকামিতা ও এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, তা রূপ নিতে পারে মহামারিতে।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত এইচআইভি পরীক্ষা করিয়েছে ১২ হাজার ৮৫২ জন। যার মধ্যে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে ১১৫ জনের শরীরে। যাদের মধ্যে পুরুষ ১০৫ জন, মহিলা নয় জন এবং হিজরা একজন। এদের মধ্যে বিবাহিত ৪৮ জন ও অবিবাহিত ৬৭ জন। বয়সের হিসাবে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ জন, ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৮০ জন। অন্যদিকে প্রবাস ফেরত আক্রান্তের সংখ্যা রয়েছে চার জন। এদের মধ্যে সমকামীর সংখ্যা ৫৮ জন, যৌনকর্মীর সংস্পর্শে এসেছেন এমন ব্যক্তি ৩৫ জন, টিবি রোগে আক্রান্ত দু’জন, যৌনকর্মী একজন, হিজরা দু’জন এবং সাধারণ ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ১৪ জন।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে রাজশাহী সিভিল সার্জন অফিস রামেক হাসপাতালের তথ্যের বাইরে শনাক্ত হওয়া ৩৪ জন রোগীর তথ্য দিয়েছে। যাদের প্রত্যেকেই সমকামী। এদের মধ্যে ৩১ জন পুরুষ এবং তিন জন হিজরা সম্প্রদায়ের। এদের মধ্যে অবিবাহিত ছয় জন এবং বিবাহিত ২৫ জন। বয়সের হিসাবে ২৫ বছরের কম বয়সী নয় জন এবং ২৫ বছরের বেশি বয়সী ২৫ জন।

রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যমতে, রাজশাহীর ৮ জেলায় সর্বমোট এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৭৯৪ জন। যার মধ্যে বগুড়ায় ১০৯ জন, চাপাইনবয়াবগঞ্জে ২১ জন, জয়পুরহাটে ৩৭ জন, নওগায় ৬৫ জন, নাটোর ৪৩ জন, পাবনায় ৭৮ জন, রাজশাহীতে ১৩১ এবং সিরাজগঞ্জে রেকর্ড পরিমাণে আক্রান্ত রোগী রয়েছেন। যাদের সংখ্যা ৩১০ জন।

তথ্য মতে, রাজশাহীতে নির্জন অন্ধকারাচ্ছন স্থানগুলোতে নিয়মিত রাতে বসছে সমকামীদের জলসা। নগরীর সি অ্যান্ড বি মোড় (শিমলা), কোর্ট স্টেশন, ডিঙা ডোবা, ফুলতলাসহ (পদ্মার পাড়) বিভিন্ন জায়গাতে দেদারসে নিষিদ্ধ এই কাজ করছেন তারা। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে গ্রুপ ও পেইজের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক গড়ে সমকামিতা প্রমোটে জোর তৎপর একটি চক্র।

তবে এসব নিষিদ্ধ কাজে খোলামেলা তৎপরতা চললেও প্রশাসনের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ লক্ষ্য করা যায়নি। এই প্রতিবেদনের অনুসন্ধানকালে কয়েকটি এনজিও’র বিরুদ্ধে সমকামিতা প্রমোটে বিভিন্নভাবে সক্রিয়তার প্রমাণও পেয়েছে প্রতিবেদক। এসব নিষিদ্ধ কাজ ও এইচআইভি ভাইরাস বিস্তাররোধে সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সুশীল সমাজ।

রাজশাহীর বারিন্দ কলেজ অব নার্সিং সায়েন্সেসের শিক্ষার্থী মাহাফুজা রাহাত বুশরা এইচআইভি’র প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধিতে সমকামিতার দায় সিংহভাগ বলে মন্তব্য করেন। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘রাজশাহীতে এইচআইভি ভাইরাসে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি সমাজ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও মানবাধিকারের সমস্যা। যৌন মুক্তি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, স্বল্প ও ভুল সূচনা এবং স্টিগমা একে একে যুব জনগণ, মাইগ্রেন্ট লেবার ও মাইনরিটি গ্রুপগুলিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।’

এইচআইভি আক্রান্তদের সমাজ বাঁকা চোখে দেখে মন্তব্য করে ভাইরাসটিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘আপোষ’র প্রকল্প ম্যানেজার এস এন আব্দুল্লাহ আল রেজা সারাবাংলাকে বলেন, ‘এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিদের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা ভালো নজরে দেখে না। তাদের ওপর বাঁকা নজর রাখে। ফলে তারা মানসিকভাবে সুস্থ জীবনযাপন করতে পারে না। এইচআইভি আক্রান্ত মানেই যৌনবাহিত নয়। বিভিন্নভাবে একজন ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। সরকার বর্তমানে এ রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা ফ্রি করে দিয়েছে। তবে সামাজিকভাবেও তাদেরকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে হবে।’

কথা হয় ঘাতক এ ভাইরাসে আক্রান্ত এক ব্যক্তির সঙ্গে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি সারাবাংলাকে জানান, অসাবধানতা ও বেপরোয়া হয়ে সমকামিতায় জড়িয়ে প্রথমে এইচআইভি ভাইরাস এবং পরে এইডস রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। সমকামিতা সমাজের ব্যাধি ও এইডস’র মূল ঝুঁকি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সমকামীদের বিশাল একটা গ্রুপ আছে, তাদের অধিকাংশ এই রোগে আক্রান্ত। আর ছোঁয়াছে রোগের মতো সমকামিতা সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ব্যাপারে এখনই সবাইকে সচেতন হতে হবে। না হলে নীরব ঘাতক এই রোগ আরও বেশি ছড়িয়ে পড়বে।’

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চিকিৎসক ও সহকারী রেজিস্ট্রার (মেডিসিন) ডা. মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে যেমন সমকামিতা বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। পুরুষ সমকামী, বিশেষ করে যারা রিসিভটিভ পার্টনার, তাদের এইচআইভিতে আক্রান্তের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এইচআইভি ভাইরাস পায়ুপথে দীর্ঘদিন সক্রিয় অবস্থায় থাকে। ফলে এ অবস্থায় কেউ সঙ্গম করলেই আক্রান্তের মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। পাশাপাশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে রক্ত আদান-প্রদান করলে, একই সুঁচ ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি মাদক নিলে, কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ব্যবহার করা সুঁচ অন্য কারও শরীরে ব্যবহার করলে, এমনকি বুকের দুধের মাধ্যমেও এইচআইভি ছড়াতে পারে।’ এখনই সমকামিতা রোধ না করা গেলে অদূর ভবিষ্যতে এ রোগ মহামারিতে রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

এদিকে এইচআইভি আক্রান্তদের ট্রিটমেন্ট নিয়েও রয়েছে ভোগান্তি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি (এআরটি) সেন্টার থাকার পরও বগুড়া শহিদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এআরটি সেন্টারে মেডিসিন নিতে হচ্ছে তাদের। ফলে একদিকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া রোগীরা আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ বিষয়ে কথা হয় একাধিক আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে। তারা জানান, গত ডিসেম্বরে রামেকে এআরটি সেন্টার চালু হয়েছে। কিন্তু যারা ডিসেম্বরের আগে শনাক্ত হয়েছে তাদের বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে ট্রিটমেন্ট নিতে হচ্ছে। ফলে চরম ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাদের।’ ফোকাল পারসন ও সিভিল সার্জনের কাছে বারবার দাবি জানিয়েও এ বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি বলে তারা জানান।

এ বিষয়ে রামেক হাসপাতালের এইচআইভি টেস্টিং অ্যান্ড কাউন্সিলিং সেন্টারের ফোকাল পারসন ডা. ইব্রাহিম মো. শরফ সারাবাংলাকে বলেন, ‘যৌনবাহিত কারণে দিন দিন রাজশাহীতে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ করে সমকামীদের মধ্যে শনাক্তের হার সবচেয়ে বেশি। যৌনপল্লিতে যাতায়াতকারীদের বড় একটা অংশ আক্রান্তের কাতারে রয়েছে।’ এই হার কমাতে ব্যক্তি সচেতনতার বিকল্প নেই মন্তব্য করে তিনি সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

আক্রান্তরা শনাক্ত হওয়া মঙ্গলজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেকেই আগে আক্রান্ত হয়েছেন। অনেকে নতুন করে হচ্ছেন। কিন্তু নতুন, পুরাতন যাই হোক- শনাক্ত হওয়া মঙ্গলজনক। কারণ, তারা সচেতন হবে। ফলে ছড়ানোর প্রবণতা অনেকাংশে কমবে।’

রোগীদের সেবা পেতে ভোগান্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘গত বছরের ডিসেম্বর মাসে রাজশাহীতে এআরটি সেন্টার চালু হয়েছে। ফলে সরকারিভাবেই রাজশাহী থেকেই ওষুধ প্রদান ও কাউন্সিলিং করা সম্ভব হচ্ছে। চিকিৎসা সেবায় বর্তমানে কোনো সংকট নেই। তবে ডিসেম্বরের আগে যারা শনাক্ত হয়েছিল তাদের বগুড়ার এআরটি সেন্টার থেকে প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়া হচ্ছে। ফাইল জটিলতার কারণে এখনো ওখান থেকে অনেককেই সেবা নিতে হচ্ছে।’

ভোগান্তি নিরসনে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে জানিয়ে ডা. ইব্রাহিম বলেন, ‘এরই মধ্যে পুরাতন ৪-৫ জনের ফাইল ট্রান্সফার করে রাজশাহী সেন্টার থেকে সেবা দেওয়া হচ্ছে। পুরোপুরি ভোগান্তি নিরসনে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ফাইল জটিলতা কাটিয়ে রাজশাহীর এআরটি সেন্টার থেকে সবাইকে সেবা দেওয়া হবে।’

তবে এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্তের সর্বশেষ পর্যায় অর্থাৎ এইডস রোগে কতজন আক্রান্ত এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর