ঢাকা: ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতা, ইট-পাথরের দেয়াল আর জীবিকার তাগিদে ছুটে চলা মানুষগুলো বছরে দু-একবার যেন এক অলৌকিক শক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। সেই শক্তির নাম ‘বাড়ি ফেরা’। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে পা রাখলে বোঝা যায়, নাড়ির টান কতটা শক্তিশালী হতে পারে। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস হওয়ায় আজ বিকেল থেকেই পুরান ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে দেখা গেছে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বিকেল গড়াতেই পন্টুন থেকে শুরু করে মূল ফটক পর্যন্ত সবখানেই কেবল মানুষ আর মানুষ, যেন তিল ধারণের ঠাঁই নেই পন্টুনগুলোতে।
বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বিকেল ৩টার পর থেকেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের প্রবেশপথগুলোতে যাত্রীদের চাপ বাড়তে থাকে। এমনকি, লঞ্চের ডেকে জায়গা পেতে অনেক যাত্রী সকাল থেকেই টার্মিনালে এসে অবস্থান নেন।
বুড়িগঙ্গার কালো পানিতে লঞ্চের ভেঁপু যখন বেজে ওঠে, তখন পন্টুনে থাকা যাত্রীদের মধ্যে এক অদ্ভুত চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বিশালাকার তিন তলা বা চার তলা লঞ্চগুলো যখন ধীরে ধীরে নোঙর ছাড়ে, তখন ডেকের জানালায় ঝুলে থাকা শত শত মানুষের হাত নেড়ে বিদায় জানানোর দৃশ্যটি যে কাউকে আবেগপ্রবণ করে তুলবে।
টার্মিনালের অবস্থা
বাড়িগামী যাত্রীদের ভিড়ে পন্টুনে তিল ধারণের জায়গা নেই। তবে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনাগামী লঞ্চগুলোতে যাত্রীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। আর লঞ্চের কেবিন অনেক আগেই বুক হয়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা ডেকের একটু জায়গার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করছেন। ডেক পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক যাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লঞ্চের ছাদে ওঠার চেষ্টা করছেন, যা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
বরিশালের মুলাদীতে বাড়ি শিমুলের। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, মোহাম্মদপুরের বাসা থেকে দুপুরে বের হয়েছি যেন ভিড় কম পাই। কিন্তু প্রচন্ড ভিড় পেয়েছি। লোকজনকে ঠেলে ঠেলে লঞ্চে উঠেছি। রাত সাড়ে আটটায় লঞ্চ ছাড়লেও বিকেলেই ডেক ও কেবিন সব কানায় কানায় পূর্ণ লোকজনে। সন্ধার পরে দেখা যাবে লোকজনের ভিড়ের কারণে কেবিন থেকেই বের হতে পারবো না।
বরিশালগামী যাত্রী আরিফুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, টার্মিনালে প্রচুর ভিড়। লোকজনকে ঠেলে অনেক কষ্টে লঞ্চে উঠেছি। কেবিন আগেই বুকিং হয়ে গেছে। ডেকেও যায়গা না পেয়ে লঞ্চের ছাদে অবস্থান নিয়েছি।
পটুয়াখালীগামী যাত্রী রহমত মিয়া বলেন, দুপুর ২টায় আইসা দুই হাত জায়গা পাইছি। এহন পরিবারের সবাই মিইলা এইখানেই ইফতার করুম। কষ্ট হইলেও শান্তি।
যানজট ও ভোগান্তি
গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পুরো রাস্তা স্থবির হয়ে আছে। ২ কিলোমিটার পথ পার হতে সময় লাগছে প্রায় ২ ঘণ্টা। সদরঘাটমুখী রাস্তায় তীব্র যানজটের কারণে গুলিস্তান থেকেই অনেক যাত্রী হেঁটে বা রিকশায় করে মালামাল নিয়ে টার্মিনালে পৌঁছাচ্ছেন। কারণ, সময় মতো না পৌঁছালে ছেড়ে যাবে গন্তব্যের লঞ্চ। সুযোগে রিকশা ও সিএনজি চালকরা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ-তিনগুণ ভাড়া আদায় করছেন। এমনকি কুলি বা মালামাল বহনকারীদের বিরুদ্ধেও বাড়তি টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ভোলার চরফ্যাশনে বাড়ি শারমিন আক্তারের। স্বামী-সন্তানসহ ঈদ করতে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, গুলিস্তানে তীব্র যানজট। সন্ধা সাড়ে ৬টায় লঞ্চ ছেড়ে দিবে, আবার লঞ্চে সিট পাওয়া নিয়ে রয়েছে ভোগান্তি। তাই ব্যাগপত্র নিয়ে সবাই পায়ে হেঁটে লঞ্চে উঠেছি। আমাদের গাড়ির পথ থাকলে হয়তো বাসে করেই যেতাম।
যানজট ও ভোগান্তি হলেও লঞ্চে উঠতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পটুয়াখালীগামী যাত্রী শফিকুল সারাবাংলাকে বলেন, ঢাকা শহরে সারা বছর কাজ করি পরিবারের জন্য। এই কয়েকটা দিন মা-বাবা এবং স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে কাটাতে না পারলে শান্তি লাগে না। ভিড় হবে জেনেই বের হয়েছি কিন্তু লঞ্চে উঠতে পেরে শান্তি লাগছে যে ভোর হলেই সবার সঙ্গে দেখা হবে।
নিরাপত্তা ও প্রশাসনের তৎপরতা
ভিড় সামলাতে এবং পকেটমার বা অজ্ঞান পার্টির দৌরাত্ম্য কমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থানে রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টার্মিনাল এলাকায় বাড়তি পুলিশ, র্যাব এবং কোস্টগার্ড মোতায়েন করা হয়েছে। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করতে লঞ্চ মালিকদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ- এর উপপরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) মো. শাহাদাত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, যাত্রীদের চাপ অনেক বেশি, তবে আমরা চেষ্টা করছি যেন সবাই সুশৃঙ্খলভাবে লঞ্চে উঠতে পারে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।
নৌ পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার সব্যসাচী মজুমদার সারাবাংলাকে বলেন, সদরঘাটে আমাদের নৌ পুলিশ তৎপর রয়েছে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। যাত্রীদের অভিযোগ পেলে আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব। তবে গতকাল দুই লঞ্চের সংঘর্ষের ঘটনা ছাড়া কোনো অপ্রীতিকর কিছু ঘটেনি।
বাড়ি পৌঁছানোর পর ভোগান্তি গল্পে পরিণত হওয়াই যেন ‘ঈদ’
এদিকে, সদরঘাটের এই ভিড় কোনো সাধারণ জটলা নয়। এটি ত্যাগের আনন্দ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা, যানজট ঠেলে ঘাটে পৌঁছানো আর লঞ্চের মেঝেতে রাত কাটানো- এই সবটুকুই সার্থক হয়ে ওঠে যখন লঞ্চটি গিয়ে নোঙর করে গ্রামের মেঠো পথের কাছের কোনো ঘাটে। সূর্য উঠলে যখন বাড়ি পৌঁছাবেন, তখন এই সব ভোগান্তি পরিণত হবে গল্পে।