ঢাকা: ২৫ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাত সোয়া ১২টা। মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা এমসিএইচ-এমপি সেন্টারে একটি ট্রাক ও একটি এক্সকাভেটর নিয়ে হামলা চালায় প্রায় দুই শতাধিক দুর্বৃত্ত। আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার ব্যবধানে টিকাদান কেন্দ্রটি একেবারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে সেন্টারে চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি, আসবাবপত্র, এসি ও টিকাসহ মালামালও লুট করা হয়। এর পর ট্রাকভর্তি মালামাল মিরপুর রেড়িবাঁধ এলাকার বিভিন্ন ভাঙ্গারির দোকানে বিক্রিও করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, সংরক্ষিত নারী আসনের স্থানীয় সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টির নির্দেশেই তার লোকজন এই ঘটনা ঘটিয়েছে। ফলে ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলা ও লুটপাটকারীদের অনায়াসেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন ফেরদৌসি আহমেদ। শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাতে সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘কে বা কারা আমার নাম জড়িয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়েছে। আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমি আইনি ব্যবস্থা নেব। যেহেতু তদন্ত কমিটি হয়েছে, তদন্ত করে দেখুক, আমি জড়িত কিনা?’
অপরদিকে হামলার কথা জানতে পেরে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাজ্জাদুল পারভেজ কয়েকবার শাহ আলী থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) কল দিয়ে জানিয়েছেন। ওসি ব্যবস্থা না নেওয়ায় তিনি মিরপুর পুলিশের ডিসিকে তথ্যটি জানান। পারভেজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ডিসি ও ওসি দু’জনই গরিমসি করে অপরাধীদের ঘটনাস্থল ত্যাগে সহযোগিতা করেছেন।’
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ওসি জাহাঙ্গীর আলম সবখানে মিসগাইড করেছেন। ঘটনার রাতে ডিসি ওসিকে কল দিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার কথা বলেছিল। জবাবে ওসি বলেন, ‘ওই জমি নিয়ে অনেকদিন ধরে বিরোধ চলছে। যারা দখল করতে গেছে তাদের কাগজ আছে।’ এর পর তিনি একজনকে ফোনটি ধরিয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পর সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কথা হয় মিরপুর পুলিশের ডিসির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দেখেন আপনার কাগজ থাকলে আপনি আইনি প্রক্রিয়ায় আসবেন। এখন ওই জায়গা থেকে তাদের চলে যেতে হবে।’
এরপর ডিসি ওসিকে আবার ফোন করলে তিনি জানান, তারা চলে গেছেন। ততক্ষণে সবকিছু লুট করে ট্রাকে তুলে নিয়ে চলে যায় দুর্বৃত্তরা। এখন প্রশ্ন উঠেছে ডিসির সঙ্গে কথা বলা ব্যক্তি কে ছিলেন। তিনি ওসির কাছে কেন? পুলিশ বলছে, সেদিন ওই ব্যক্তি ভাঙচুরের নেতৃত্বে ছিলেন। আরেকটি গ্রুপ সাদা মাইক্রোবাসে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন, আর অন্য একটি গ্রুপ থানায় ওসির রুমে ছিলেন। অর্থাৎ ওসি বিষয়টি আগে থেকেই জানতেন এবং ইচ্ছা করেই তিনি ঘটনাস্থলে যাননি। অথচ থানা থেকে ঘটনাস্থলের দূরত্ব মাত্র দেড় থেকে দুই মিনিটের পথ। এখন ওসি এবং ওই ব্যক্তিকে তদন্তের আওতায় আনতে পারলেই প্রকৃত অপরাধীদের বের করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে সরকারি এক্সকাভেটর হাসপাতাল ভাঙ্গার কাজে কার অনুমতিতে কারা আনলেন। সেটিও আবার রাতের আধাঁরে। সিটি করপোরেশনও কিছু জানে না। রাজউক তো জানেই না। তাহলে কোথা থেকে কীভাবে এস্কেভেটর এলো- সেটা তদন্ত ছাড়া জানার উপায় নাই। তবে পুলিশ বলছে, সবকিছু তদন্তের আওতায় রয়েছে।
যেখানে আইন বলছে, ২০২৬-এর ধারা ৩৪(১) অনুযায়ী, রাজউকের আওতাধীন এলাকায় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইমারত অপসারণ বা ভাঙার সুযোগ নেই, নিজের জমিতেও বুলডোজার বা এক্সকাভেটর ব্যবহার করতে হলে রাজউকের অনুমতি লাগবে। তাহলে সরকারি কাজে ব্যবহৃত এক্সকাভেটর ওখানে গেল কীভাবে, অনুমোদনটা দিল কে? এর উত্তর খুঁজছে স্থানীয়রা।
তাদের প্রশ্ন, সমমনা দোকানদার সমবায়ের নামে কারা সাইনবোর্ড লাগাল? তারা এখন কই? এখনো কেন সাইনবোর্ড রয়েছে সেখানে? পুলিশ যেখানে সহযোগিতা করেছে, সেখানে জনগণ কেন বাধা দিতে যাবে? পুলিশ ওই সমিতির সবাইকে চেনে।
জানা যায়, ২০০৬ সালের দিকে তৎকালীন স্থানীয় কাউন্সিলর ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি সমমনা সমবায় সমিতির নামে হাসপাতালের ওই জায়গাটি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছিল। সেজন্য অনেকেই সন্দেহ করছেন, মিষ্টি সংসদ সদস্য হওয়ার পর রাতের আধাঁরে চক্রটি ভবন গুঁড়িয়ে দিয়ে দখলের সাইনবোর্ড লাগায়। যদিও সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
আবার ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির’ আরেক নেতা হানিফ মিয়ার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। যদিও বিএনপির এই নেতাও এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এখন প্রশ্ন, ভাঙচুরে যদি কেউই জড়িত না হন, তাহলে সেদিন রাতে টিকাদান কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিল কারা? তা জানতে অপেক্ষায় থাকতে হবে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া পর্যন্ত।
এদিকে ঘটনার পর শনিবার ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম সরেজমিনে পরিদর্শন করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। একই দিন ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেছেন, ‘ঘটনার সঙ্গে এমপি-পুলিশ যেই জড়িত থাকুক না কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে ছাড়া হবে না। এজন্য তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে তা বের করতে হবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’