ঢাকা: মেট্রোরেলে ওঠার আগেই আমি আমার ব্যাগটি পিঠ থেকে নামিয়ে হাতে নিই। এর পর মেট্রোতে উঠে ব্যাগটি হাতেই রাখি। অন্তত ১০ ভাগ যাত্রী ব্যাগটি হাতেই রাখে। তবে মুশকিলের ব্যাপার হলো- ৯০ ভাগ যাত্রীই তাদের ব্যাগটি হাতে না নিয়ে পিঠেই রেখে দেয়। ফলে একদিকে যেমন স্থান সংকুলান না হওয়া মেট্রোরেলের জায়গা দখল করছে, অন্যদিকে অন্যান্য যাত্রীদের ব্যাপকভাবে কষ্ট দিচ্ছে। এমনকি ব্যাগওয়ালা বেশিরভাগ ব্যক্তিই বিষয়টি নিয়ে কথা বললে গ্রাহ্য করেন না, বরং উলটো কথা শুনিয়ে দেন। কেউ কেউ তো ঝগড়া ও মারামারি পর্যায়ে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করেন।
মেট্রোতে লক্ষ্য করা গেছে, ব্যাগ নিয়ে বের হওয়া বেশিরভাগ যাত্রীই তরুণ। বয়স্কো যারা ব্যাগ নিয়ে ওঠেন তারা নিজেরাই নামিয়ে নেন অথবা কেউ বললে দ্রুত ব্যাগ পীঠ থেকে নামিয়ে হাতে নিয়ে নিচে ধরেন। এতে অন্যান্য যাত্রীদের দাঁড়াতে সহজ হয়।
সম্প্রতি আগারগাঁও থেকে মতিঝিলগামী দুই যাত্রী অনেক কষ্টে মেট্রোতে ওঠেন। দুজনের পিঠেই দু’টি ব্যাগ। এবং সেগুলো দেখতে বেশ বড়। অন্তত আরও দু’জনের জায়গা দখল করেছে। দাঁড়ানোর জায়গা নেই, তবুও ব্যাগ পিঠে রেখেই ঠেলছেন। একজন যাত্রী বললেন, ‘ব্যাগ পিঠ থেকে নামিয়ে হাতে নিন।’ ওনারা দু’জনই ক্ষেপে উঠলেন- ‘ব্যাগ কেন হাতে নিবো? আপনি কচু জানেন।’ জবাবে অনেক যাত্রী তাদের কথার প্রতিবাদ করলেন। তবুও কাজ হলো না। ওনারা ওই ভিড়ে ব্যাগ পিঠেই রাখলেন।
মেট্রোতে ওঠা যাত্রীদের মধ্যে ব্যাগ হাতে নেওয়া লোকের সংখ্যা খুবই কম। কর্তৃপক্ষ নানা বিষয়ে সতর্ক করলেও ব্যাগ হাতে নেওয়ার বিষয়ে কোনো সতর্ক বার্তা বা নির্দেশনা নেই। ফলে অন্য যাত্রী এ বিষয়ে বললেও ব্যাগওয়ালা যাত্রী প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিলগামী ট্রেনে ওঠা যাত্রী সাখাওয়াত হোসেন বুলু সারাবাংলাকে বলেন, ‘এটি কোনো নির্দেশনার বিষয় নয়। এটি যাত্রীর উপলব্ধির বিষয়। শিক্ষিত কোনো ব্যক্তি এরকম ব্যাগ পিঠে নিয়ে ভ্রমণ করতে পারেন না। মানুষের কষ্ট হয় এরকম কোনো কাজ কারও উচিত না।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার মেট্রোতে শুধু ব্যাগের বিষয় নয়, বরং আরও কিছু বিষয় আছে, যা আমাদের লজ্জিত করে। যেমন ট্রেনে ওঠার সময় অনেকেরই লাইন মেইনটেইন না করার প্রবণতা রয়েছে। চলন্ত সিঁড়ি দিয়ে ওঠা বা নামার সময় পুরোটাই দখল করে চলাচল করার প্রবণতা রয়েছে। অথচ বিদেশে চলন্ত সিঁড়িতে যেকোনো একদিকে দাঁড়ানোর ডিসিপ্লিন দেখা যায়। ট্রেনে ওঠার ক্ষেত্রেও কোনোভাবে লাইন ছাড়া কেউ দাঁড়ায় না। ব্যাগ হাতে নেওয়ার বিষয়টি তো রয়েছেই।’
কারওয়ান বাজার থেকে উত্তরাগামী ট্রেনে ওঠা যাত্রী বজলুর রহমান মানিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বয়সে তরুণ এমন যাত্রীরাই ব্যাগের বিষয়টি নিয়ে ঝগড়া লাগায়। কিছু চাকরিজীবী রয়েছে তারাও ব্যাগ পিঠ থেকে হাতে নিতে চান না। আবার তারাই যখন সিট পেয়ে বসতে যান তখন ঠিকই ব্যাগ পিঠ থেকে নামিয়ে হাতে নিয়ে বসেন। অথচ পিঠে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন সেটি বুঝতে পারেন না তারা। আগ বাড়িয়ে কেউ ব্যাগটি হাতে নিতে বললেও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন।’
সম্প্রতি বেশ কয়েকটি দেশ ঘুরে এসেছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গেও কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তাদের একজন বলেন, ‘সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় বেশিরভাগ সময় মেট্রোতে যাতায়াত করেছি। সেখানে সবাই ডিসিপ্লিন মেইনটেইন করে। কেউ কাউকে শিখিয়ে দিতে দেখিনি। সেখানে একজনেরটা আরেকজন দেখে শিখছে। কোথাও কেউ ময়লা ফেলেন না। ট্রেনে ওঠা-নামার ক্ষেত্রে নিয়ম ফলো করছে। স্টেশনে এত স্টাফও নেই, আনসার বা নিরাপত্তাকর্মীও নেই, এমনকি পুলিশও নেই। চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করার জন্য একদিকে দাঁড়ান যাত্রীরা। কারও এমার্জেন্সি থাকলে অন্যপাশ দিয়ে দ্রুত উঠতে বা নামতে পারছেন। কারও কষ্ট হবে এরকম কাজ কেউ করেই না। কিন্তু বাংলাদেশে এর ব্যতিক্রম।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শেওড়াপাড়া স্টেশনের সহকারী ম্যানেজার আরশাদ হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিষয়টি সম্পুর্ণ কমনসেন্সের। ব্যাগের কারণে অনেক মানুষের কষ্ট হচ্ছে। কেউ দাঁড়াতে পারছেন না। নিজেরও কষ্ট হয় দাঁড়িয়ে থাকতে। তবুও তাদের হিতাহিত জ্ঞান কাজ করছে না। বিষয়টি খুবই পীড়াদায়ক।’ এটি অবসানের জন্য মাইকে অ্যালাউন্স করতে পরবর্তী মিটিংয়ে আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ঢাকার মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) (অতিরিক্ত সচিব) মো. শাওগাতুল আলমকে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।