Monday 02 November 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

মেয়েদের বানাতে চান হাফিজা / দিনে রিকশাচালক, রাতে ঝাড়ুদার হালিমা

শামিম হোসেন শিশির, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২ নভেম্বর ২০২৬ ১৪:১০

রিকশাচালক হালিমা বেগম। ছবি: সারাবাংলা

ঢাকা: হেমন্ত শুরু হলেও আবহাওয়ায় কোনো আভাস নেই। বরং, বেশ ক’দিন ধরে দুপুরে রাজধানীতে কড়া রোদ আর ভ্যাপসা গরম। আর এই রোদে ঘেমে একাকার অবস্থা। এমন সময় হঠাৎ চোখ আটকে গেল দূরের এক রিকশায়। গলির রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে ব্যাটারিচালিত এক রিকশা, চালকের আসনে সালোয়ার-কামিজ পড়া মাঝবয়সী এক নারী! চোখে আত্মবিশ্বাস আর ‍দৃঢ়তা। কিন্তু শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। কাছে গিয়ে জানা গেল, চালকের আসনে বসা নারীর নাম হালিমা বেগম (৩৯)।

হালিমার বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। থাকেন রাজধানী ঢাকার মহাখালী সাততলা বস্তিতে। স্বামী পঙ্গু, তাদের রয়েছে চার সন্তান। এদের মধ্যে দুই মেয়ে হাফিজা হওয়ার জন্য পড়ছেন, পাশাপাশি তাদের প্রাইমারি স্কুলেও ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পরিবারে একমাত্র উপার্যক্ষম ব্যক্তি এই হালিমা বেগম। বাচ্চাদের লেখাপড়ার খরচ আর সংসার চালাতে হালিমা দিনে রিকশা চালান, আর রাতে কাজ করেন ঝাড়ুদারের।

বিজ্ঞাপন

হালিমা রাতে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। রাতে রাস্তা ঝাড়ুর কাজ করেন তিনি। সকালে বাসায় ফিরে রান্না করে খাওয়া, এর পর খানিক ঘুমিয়ে বেরিয়ে পড়েন রিকশা নিয়ে। হালিমার এমন জীবন চলছে একদিন দু’দিন ধরে নয়, সাত-আট বছর ধরে! দু’চোখ মুছতে মুছতে হালিমা সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার মতো কষ্ট যেন আমার সন্তানদের করা না লাগে, সেই কারণেই এত খাটনি করি।’

ঈশ্বরগঞ্জের দরিদ্র পরিবারে জন্ম হালিমার। জীবনের বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলেন ঠিকমতো বুদ্ধি হওয়ার আগেই। রেলস্টেশন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন চার বছর বয়সে। সেই দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করে হালিমা বলছিলেন, ‘চার বছর বয়সে হারাই যাওয়ার পর রাস্তায় থাকছি, ভিক্ষা করে খাইচি, রাস্তায় প্লাস্টিক টোকাইচি।’ হারিয়ে যাওয়ার তিন বছর পর খুঁজে পান বাবা-মাকে।

অল্প বয়সেই বিয়ে হওয়া হালিমা মা-ও হয়েছেন কম বয়সেই। স্বামীর অভাবের সংসার। তবুও বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু করোনা ভাইরাস মহামারির আগে তার জীবনে নেমে আসে আরেক অন্ধকার। টায়ফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা গাফিলতিতে পঙ্গু হয়ে যান হালিমার স্বামী। তার কিছুদিন পর করোনা ভাইরাসের হানায় বন্ধ হয়ে যায় সবধরনের ইনকাম। পাতে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত ওঠে না। ফলে বাধ্য হয়ে রিকশার হ্যান্ডেল বেছে নেন হালিমা।

রিকশাচালক হালিমা বেগম। ছবি: সারাবাংলা

রিকশাচালক হালিমা বেগম। ছবি: সারাবাংলা

নারীদের জন্য অন্য অনেক পেশা থাকতে রিকশা চালানোর মতো কঠিন কাজে কেন নামলেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে হালিমা বলেন, ‘বাধ্য হয়েই বেছে নিতে হয়েছে এই কঠিন পেশা। সিটি করপোরেশনের কাজে বেতন দেয় দুই/তিন মাস পর। তাও আবার সাত-আট হাজার। আমাগো বেতন আরও বেশি। কিন্তু খেয়ে ফেলে অন্যরা। আমাগো হাতে আসে সাত-আট হাজার টাকা। বাড়িওয়ালা তো এসব শুনব না। তাছাড়া পেটও তো চালান লাগবো।’

করোনা ভাইরাসের সময় ইনকাম পুরোপুরি বন্ধ, কোনো কাজ মিলছে না, সন্তানদের পাতে দু’বেলা ভাত উঠছে না। বস্তির অনেকে দেহ ব্যবসায় নামার প্রলোভন দেখাতে থাকেন। হালিমা সেসব ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখান করে বাধ্য হয়েই একদিন রিকশা নিয়ে রাস্তায় নামেন। তিনি বলেন, ‘খারাপ পথে যাওয়ার জন্য অনেকে বলছে। কিন্তু, আমি তাদের বলেছি, আমার ঘরে তারা যাতে এই কথা নিয়ে না আসে। কারণ, আমি সেই পথে যেতে চাই না। আমি যদি যাইতাম, একদিন হয়তো আমার মেয়েরাও সেই পথে যাইতো।’

রিকশা চালাতে প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত, রাস্তায় অনেক হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমনকি মারও খেয়েছেন হালিমা। তিনি জানালেন, প্রথমে ছেলেদের প্যান্ট-শার্ট কিনে সেসব পরে মুখে রুমাল পেঁচিয়ে রিকশা চালাতেন যেন পরিচিতরা চিনতে না পারে। শুরুতে রিকশা চালানোর হাত পাকা ছিল না, অন্য কোনো রিকশার সঙ্গে কখনো লাগিয়ে দিয়েছেন। এতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বহুবার। হালিমা বলছিলেন, ‘নতুন নতুন আমার রিকশা কখনো অন্য রিকশার সঙ্গে লাগাই দিসি। তাতে কতবার যে আমারে মারছে, অশ্লীল ভাষায় বকছে তার হিসাব নেই।’ পিছনে ফেরার রাস্তা ছিল না। বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘রিকশার হ্যান্ডেল ধরলে চুলায় পাতিল উঠত, আর না ধরলে উঠত না।’

সন্তানদের পড়ালেখা, খাওয়া-দাওয়াসহ সংসার চালানো, সেইসঙ্গে অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা খরচ, সবই চালাতে হয় হালিমাকে। প্যাডেল চালিত রিকশার বদলে পরে একজনের কাছ থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালানো শিখেছেন। বছর দুই আগে এক সংস্থার পক্ষ থেকে রিকশা পেয়েছিলেন অনুদান হিসেবে। মহাখালীর সাততলা বস্তির এক গ্যারেজে রাখতেন তালা লাগিয়ে। একদিন তালা ভেঙে রিকশা চুরি হয় গ্যারেজ থেকেই। যেন ‘পোড়া কপাল যার, যেখানে যায় দুঃখ তার’!

রিকশাচালক হালিমা বেগম। ছবি: সারাবাংলা

রিকশাচালক হালিমা বেগম। ছবি: সারাবাংলা

তার পর থেকে আবারও সেই ভাড়ায়চালিত রিকশাই চালাচ্ছেন। হালিমার এই জীবন সংগ্রাম চলছে একটি স্বপ্নের পেছনে ছুটছে— দুই মেয়ে একদিন হাফিজা হবে, পড়ালেখা শিখে মানুষের মতো মানুষ হবে।

হালিমা সরকারি কোনো ভাতা পান না, কারও কাছ থেকে কিছু পাওয়া বলতে হারিয়ে যাওয়া সেই রিকশাটাই শুধু। কারও কাছে কিছু চানও না। তিনি বলেন, ‘কারও কাছে হাত পাততে চাই না। আমি কাজ চাই। আমি কর্ম করেই চলতে চাই, মেয়েদের হাফেজা বানাতে চাই। যদি কেউ আমাকে একটা কাজ দিতো অথবা একটা রিকশা দিতো আমার জন্য খুব ভালো হতো।’

হালিমা বলতে থাকেন, ‘আমার জীবনে কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। সন্তানরা যাতে মানুষ হয়, আমার মতো কষ্ট তাদের যাতে কোনো দিন না করতে হয়…।’ তিনি কথাগুলো যখন বলছিলেন তার দু’চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু।

সারাবাংলা/এসএইচএস/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

ঢাকার বায়ু ‘অস্বাস্থ্যকর’
২ নভেম্বর ২০২৬ ১৩:০০

আরো

সম্পর্কিত খবর