জবি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সবাইকে সাধারণ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের প্রতিযোগিতায় না রেখে কর্মসংস্থান ও বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে উচ্চশিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন, গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সোমবার (২ নভেম্বর) জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) দিবস ও বিশ্ববিদ্যালয়টির ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি অর্জন কিংবা চাকরি খোঁজার প্রতিষ্ঠান নয়; এটি মুক্তচিন্তা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্র। শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হলে প্রচলিত ধারার বাইরে এসে প্রযুক্তি ও কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। সবাইকে সাধারণ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী করে তোলার পরিবর্তে এমন জনশক্তি গড়ে তুলতে হবে, যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারবে।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে শিক্ষাব্যবস্থায় অপসংস্কৃতি, ধর্মীয় বিভেদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক দূষণ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। শুধু জিপিএ-৫ কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলের সংখ্যা বাড়ানোই শিক্ষার সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। বরং শিক্ষার গুণগত পরিবর্তন, সৃজনশীলতা ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সবাই পিএইচডি কিংবা সাধারণ স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পেছনে ছোটে না। বরং নিজেদের সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানের বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাকেও এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুনর্গঠন করতে হবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তির ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন বৈশ্বিক অর্থনীতি ও শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান ও চীনের মতো দেশ এ খাতে বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশেরও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার প্রস্তুতি নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত শিক্ষাধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আধুনিক প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। ভবিষ্যতের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে উচ্চশিক্ষার বিষয় নির্বাচন এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শুধু তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলো উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশকে নতুন নতুন শিল্প ও প্রযুক্তির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকেন্দ্র স্থানান্তর করেছে। ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশ এসব সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তির ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সুবিধা নিতে পারেনি।
তার মতে, আগামী পাঁচ বছরের চাহিদা বিবেচনা করলেই চলবে না; বরং ৫০ থেকে ১০০ বছর পর বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চাই, সেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। এ ক্ষেত্রে তরুণদের উদ্ভাবনী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও গবেষণার বিকল্প নেই।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২০০ একর জমিতে আবাসিক সুবিধাসহ আধুনিক স্বতন্ত্র ক্যাম্পাস নির্মাণের কাজ চলছে। পাশাপাশি অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য স্টাইপেন্ড চালুর উদ্যোগকেও তিনি প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেন।
এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস স্মরণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৬ সালে সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করা হয়।
বক্তব্যে দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার আগে জনগণ, সবার আগে দেশের স্বার্থ’- এই চেতনাকে ধারণ করতে হবে। স্বাধীন ভূখণ্ড ও জাতীয় পতাকা অর্জনের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে দেশকে নিজের বলে ভাবার মানসিকতা ও দেশপ্রেম গড়ে তোলা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি ইতালির একটি গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত প্রায় ২০০ বছর আগের স্থাপনা-সংক্রান্ত নথির উদাহরণ দেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে তিনি জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষাক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।