চট্টগ্রাম ব্যুরো: চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় জামায়াতকর্মী জামাল উদ্দিন হত্যার রহস্য উন্মোচন করেছে পুলিশ। ঝুট কাপড়ের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিদেশে পলাতক চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তার বাহিনীর একদল সন্ত্রাসী এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যার আগে জামালের ঘনিষ্ঠ সহযোগী নাজিম উদ্দিন প্রকাশ বাইট্ট্যা নাজিমকে নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম হয় সাজ্জাদ বাহিনী। এরপর তাকে ব্যবহার করে জামালের গতিবিধি অনুসরণ করে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। মূলত ঘনিষ্ঠ সহযোগীর ‘বেঈমানির’ কারণে প্রাণ গেছে জামালের, যে নিজেও তিনটি হত্যা মামলার আসামি।
মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) রাতে চট্টগ্রাম নগরীর কোতোয়ালী থানার লালদিঘীর পাড় এলাকা থেকে নাজিম উদ্দিনকে (৫২) গ্রেফতার করে পুলিশ ও র্যাবের একটি যৌথ টিম। নাজিমের বাড়ি ফটিকছড়ি উপজেলার লেলাং ইউনিয়নে।
বুধবার (১৪ জানুয়ারি) নাজিম হত্যাকাণ্ডে নিজের দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন নাজিম।
এর আগে, গত ১০ জানুয়ারি রাতে ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর গ্রামের দিঘীরপাড় এলাকায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন জামাল উদ্দিন (৪৫)। আহত হন তার সঙ্গে মোটরসাইকেলে থাকা নাছির উদ্দিন (৪২) নামে এক সহযোগী। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে আসা তিন দুর্বৃত্ত বাইক আরোহী জামাল ও নাছিরকে এলোপাতাড়ি গুলি করে পালিয়ে যায়। এ সময় ঘটনাস্থলে নাজিমও ছিলেন। গুলিবর্ষণের পর জামালের মোটরসাইকেল নিয়ে নাজিম পালিয়ে যায়।
পুলিশ জানায়, নিহত জামালের মোটরসাইকেলটি নাজিম লেলাং গ্রামে তার বাড়ির পাশে জনৈক কাবিল মিস্ত্রির বাড়িতে নিয়ে লুকিয়ে রাখেন। গ্রেফতারের পর তার দেওয়া তথ্যে পুলিশ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১১টি পিস্তলের খোসা উদ্ধার করেছিল।
গ্রেফতার নাজিমকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিহত জামাল, আহত নাছির এবং গ্রেফতার নাজিম- তিনজনই ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তারা নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় বিভিন্ন পোশাক কারখানার ঝুট কাপড়ের ব্যবসা করেন। আবার কারখানা থেকে অবৈধভাবে পরিত্যক্ত তৈরি পোশাকও বের করে বিক্রি করে। একই এলাকায় ঝুট কাপড়ের ব্যবসার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আছে বড় সাজ্জাদের গ্রুপের। গতবছর একটি কারখানার ঝুট কাপড়ের জন্য বড় সাজ্জাদ এবং জামাল- উভয়ের পক্ষে টেন্ডার ড্রপ করা হয়। জামাল টেন্ডারটা পেয়ে যান। সেই থেকে বিরোধের শুরু।’
‘জামালেরও ছোটখাট গ্রুপ আছে। সে-ও তিনটি হত্যা মামলার আসামি। বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তার বাহিনীর লোকজন নাজিমকে নিজেদের পক্ষে নিতে সক্ষম হয়। মূলত নাজিমই তার দীর্ঘদিনের বন্ধু বা সহযোগী জামালের সঙ্গে বেঈমানিটা করে ফেলে। সে জামালের সকল তথ্য তাদের দিতে থাকে। ঘটনার দিন বড় সাজ্জাদের বাহিনীর তিন সন্ত্রাসীকে জামালই পথ দেখিয়ে শাহনগরে নিয়ে যায়। নাজিমের উপস্থিতিতেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তিনজনের বিষয়ে কিছু তথ্য আমরা পেয়েছি, তবে তদন্তের স্বার্থে আমরা সেটা প্রকাশ করতে চাই না।’
জামাল হত্যাকাণ্ডে বড় সাজ্জাদের আস্থাভাজন সন্ত্রাসী ইমন ও মোবারকের নাম পুলিশ জানতে পেরেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম জেলা ও নগর পুলিশের সূত্রমতে, প্রায় দুই দশক ধরে বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেন পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদ। এক সময় ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় বড় সাজ্জাদ ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত। নগরীর পাঁচলাইশ, বায়েজিদ বোস্তামি, বাকলিয়া, চকবাজার এলাকা থেকে জেলার হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া পর্যন্ত তার অপরাধের সাম্রাজ্য বিস্তৃত। অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি, বালুমহাল-ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ভবন নির্মাণে ইট-বালুসহ নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে প্রভাব বিস্তার এবং রাজনৈতিক আধিপত্য- সবই তার নিয়ন্ত্রণে।
সম্প্রতি শিল্পপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের নগরীর চন্দনপুরার বাসভবন লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের একটি ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। চাঁদা না পেয়ে বড় সাজ্জাদের নির্দেশে তার বাহিনীর সদস্যরা এ ঘটনা ঘটায় বলে পুলিশের ভাষ্য।