ঢাকা: জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনে গঠিত বহুল আলোচিত ২ বিশেষায়িত ইউনিট—কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি) ও অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) বিলুপ্ত করা হচ্ছে। এর পরিবর্তে নতুন নামে গঠন করা হচ্ছে ‘স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিট’ (এসসিইউ)।
সোমবার (১১ মে) পুলিশ সদর দফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা সারাবাংলাকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন ইউনিটের অর্গানোগ্রাম তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। আপাতত রাজধানীর মিন্টো রোডে বর্তমান সিটিটিসির কার্যালয়েই এসসিইউর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পরে ইউনিটটির প্রধান কার্যালয় আগারগাঁওয়ের শেরেবাংলা নগর এলাকায় স্থানান্তর করা হবে।
পুলিশ সদর দফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, গত কয়েক বছরে জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমনের নামে সিটিটিসি ও এটিইউর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে গুম, হত্যা, হয়রানি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও ধর্মীয় ব্যক্তিদের আটক রেখে অর্থ আদায়, পরিবারের সদস্যদের হেনস্থা ও নির্যাতন এবং ধর্ষণের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ ও অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নের ভিত্তিতেই নতুন কাঠামোতে ইউনিট পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার মনে করছে, সিটিসিটি ও এটিইউ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ দমনের নামে অনেক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করেছে। ইউনিট দুটির অনেক দুর্নাম রয়েছে। তাই এই দুটি ইউনিট একীভূত করে নতুন ইউনিট করা হচ্ছে। সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ শব্দসংশ্লিষ্ট নামের কোনো ইউনিট পুলিশে থাকবে না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দুটি ইউনিটকে একীভূত করে এসসিইউ গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সিটিটিসি ও এটিইউর জন্য পৃথক দুইজন অতিরিক্ত আইজিপি দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন ইউনিটে একজন অতিরিক্ত আইজিপি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। একইসঙ্গে ইউনিটটির কার্যপরিধিও পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, নতুন ইউনিটের অর্গানোগ্রাম ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে। বাকি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ হলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে প্রক্রিয়াটি চলমান রয়েছে। সবকিছু চূড়ান্ত হলে বিস্তারিত জানানো হবে।’
প্রসঙ্গত, ২০১৬ সালে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনের লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অধীনে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট গঠন করা হয়। শুরুতে ইউনিটটির নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম। ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতে এই ইউনিট আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করে। এর কাজের এলাকা ছিল ঢাকা মহানগর। এটি ৭টি সাব-বিভাগে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে রয়েছে—স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপ (সোয়াট), সাইবার ক্রাইম তদন্ত বিভাগ, ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম, ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড অ্যানালাইসিস, বোম্ব ডিসপোজাল টিম ও বিশেষ প্রশিক্ষিত কে-নাইন টিম (কে-৯)। ঢাকায় বড় কোনো ইভেন্ট হলে সোয়াট নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এটি অনেক ‘জঙ্গি আস্তানায়’ অভিযান চালিয়েছে, জঙ্গি নেতা ও উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেফতার করেছে।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলার পর ওই বছরে সিটিটিসি কল্যাণপুর, শাহ আলী, বংশাল, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, আশকোনা, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুরের পাতারটেক, টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু বাড়িতে অভিযান চালায়। পুলিশ তখন বলেছিল, ওসব বাড়ি ‘জঙ্গি আস্তানা’। অভিযানে কল্যাণপুরে ‘নব্য জেএমবির’ ৯জন, নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ৩জন, গাজীপুরের পাতারটেকে ৭জনসহ বিভিন্ন স্থানে অনেকে নিহত হয়। পুলিশ নিহত ব্যক্তিদের জঙ্গি হিসেবে আখ্যায়িত করেছিল। সিটিটিসির ওই সব অভিযান নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। কল্যাণপুরে ‘জাহাজবাড়িতে’ ৯ জন নিহত হওয়ার ঘটনায় বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাও হয়েছে।
সিটিটিসি গঠনের এক বছর পর ২০১৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সারা দেশে উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অ্যান্টি টেররিজম ইউনিট (এটিইউ) গঠন করা হয়। সারা দেশে কাজ করা এই ইউনিট পুলিশ সদর দফতরের তত্ত্বাবধানে চলে। এই ইউনিটের প্রধান একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সিটিটিসি ও এটিইউর কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেকেই মুখ খুলেছেন। এ দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম, আটক রাখা, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগও ওঠে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বজনদের নিয়ে গঠিত সংগঠন ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক এবং বর্তমান সংসদের বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, ‘এসব ইউনিটে গোপন বন্দিশালা ছিল। সেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। নির্যাতন করা হতো।’
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত গুমসংক্রান্ত কমিশনের প্রতিবেদনেও সিটিটিসি ও এটিইউর বিরুদ্ধে নির্যাতন ও এগুলোর গোপন বন্দিশালা থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
এই দুই ইউনিটের বিরুদ্ধে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটেই এখন নতুন কাঠামোয় বিশেষ নিরাপত্তা ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।