ঢাকা: ২০১৩ সালের ৫ মে— রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়। তবে পুলিশের ওই অপারেশনে ঠিক কতজন নিহত হয়েছেন—এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এক যুগ পরও মেলেনি। বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যানের কারণে নিহতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
ঘটনার পরপরই হেফাজতে ইসলাম তাদের প্রাথমিক তালিকায় ৯৩ জন নিহতের দাবি করে। সংগঠনটি তখন জানায়, যাচাই-বাছাই শেষে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। অন্যদিকে বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ ওই রাতে ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। ২০১৪ সালে ‘শহিদনামা’ নামে একটি গ্রন্থে ৪১ জন নিহতের তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে সরকারিভাবে সে সময় মাত্র ৪ জনের নিহতের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে ৩ জন নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষে নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়। ফলে সরকারি হিসাবে শাপলা চত্বরে অভিযানের সময় ১ জন নিহত হয়েছিল বলে দাবি করা হয়।
পরবর্তীতে হেফাজতের নেতারা অভিযোগ করে বলেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের দমন-পীড়নের ভয়ে তারা তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে হতাহতের তথ্য প্রকাশ করতে পারেননি। ২০২৪ সালে আ.লীগ সরকার পতনের পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে নিহতের সংখ্যা প্রায় ৩০০ বলে দাবি করা হয়। একইসঙ্গে বেসরকারি টিভি চ্যানেল জিটিভিতে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর হেফাজতের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও ওই সময়ের সরকার তা এগোতে দেয়নি আ.লীগ। এমনকি মাদরাসা শিক্ষার্থীদের বেশিরভাগই এতিম হওয়ায় তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগও পাওয়া যায়নি।
ঘটনার প্রায় এক দশক পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর (আওয়ামী লীগ সরকারের পতন) বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের অধীনে স্বাধীন তদন্ত শুরু হয়।
সর্বশেষ তদন্তে ট্রাইবুনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই রাতে ৫৮ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে বলেও জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘ওই রাতে শান্তিপূর্ণ, নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর ইতিহাসের বর্বরোচিত ও ন্যক্কারজনক গণহত্যা চালিয়েছে তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সরকার শুধু মানুষ হত্যা করেই ক্ষান্ত থাকেনি, বরং মরদেহগুলো বুঝিয়ে না দিয়ে তা গুম করেছে। প্রায় এক যুগ হতে চলেছে, এখনও সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার পাইনি। এতদিন তদন্ত রিপোর্টই ছিল না। বর্তমান সরকারের সময়ে তদন্ত চলমান। আশা করছি, এই হত্যাকাণ্ডের উপযুক্ত বিচার পাব।’