ঢাকা: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ওয়েবসাইট ক্লোন করে এআই ট্রাফিকের জরিমানার নামে প্রতারক চক্রটি একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে। এ ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করেছে সিআইডি।
মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে সিআইডি হেডকোয়ার্টার্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের (সিপিসি) অতিরিক্ত ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান। গ্রেফতার তিনজন হলো- মো. রাব্বি শেখ (২৪), মো. রিয়াদ হোসেন (৩১) ও মো. সাজ্জাদ হোসেন (৩১)। উত্তরা পশ্চিম থানায় তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান বলেন, “অফিসে যাওয়ার ব্যস্ততা কিংবা দিনের কর্মব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটি এসএমএস, ‘আপনার গাড়ি ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করেছে। জরিমানা পরিশোধ না করলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ মেসেজে বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটের মতো দেখতে একটি লিংক। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম ও সম্ভাব্য আইনি ঝামেলার ভয় থেকে অনেকেই তড়িঘড়ি করে লিংকটিতে প্রবেশ করলে দেখতে পান বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটের আদলে একটি ওয়েবসাইট। সেখানে জরিমানা পরিশোধের নামে ব্যাংক কার্ডের তথ্য দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মোবাইলে আসে ওটিপি। ভুক্তভোগী বুঝে ওঠার আগেই তার ব্যাংক হিসাব বা কার্ড থেকে টাকা কেটে নেওয়া হয়।”
অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, ‘সম্প্রতি ঠিক এমন কৌশলেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। বিআরটিএ-এর ওয়েবসাইটের আদলে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করে ট্রাফিক জরিমানা আদায়ের নামে মানুষের ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে চক্রের তিন সদস্যকে খুলনা, ফেনী ও ঢাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার সিআইডি।’
তিনি বলেন, ‘ভুক্তভোগী বাদী তার মোবাইল ফোনে বিআরটিএ-এর নামে ট্রাফিক জরিমানা ও মামলা সংক্রান্ত এসএমএস পান। এসএমএসে দেওয়া লিংকে প্রবেশ করে তিনি দেখতে পান যে তার অফিসের গাড়ির বিরুদ্ধে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ৩ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়েছে, যা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পরিশোধ করলে ১ হাজার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। বিষয়টি সত্য মনে করে তিনি জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি অনলাইন পেমেন্ট পোর্টালে প্রবেশ করেন এবং সেখানে তার স্ত্রীর ক্রেডিট কার্ডের তথ্য, ব্যাংক অ্যাপের লগইন তথ্য ও ওটিপি দেন। পরে দেখতে পান জরিমানার অর্থ পরিশোধের পরিবর্তে তার স্ত্রীর ব্যাংক হিসাব থেকে ৩ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে অন্য একটি ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারে (সিপিসি) অভিযোগ করেন।’
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, ‘সিপিসিতে একই ধরনের আরও দুটি অভিযোগে দেখা যায়, প্রতারক চক্র ভুয়া ট্রাফিক মামলা ও জরিমানার ভয় দেখিয়ে এসএমএসের মাধ্যমে ফিশিং লিংক পাঠিয়ে ভুক্তভোগীদের ব্যাংক কার্ড, অ্যাকাউন্ট ও ওটিপি তথ্য সংগ্রহ করে তাদের হিসাব থেকে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে তদন্ত ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে শুরু করে। চক্রটি বিভিন্ন ব্যক্তির মোবাইল নম্বরে এসএমএস প্রেরণ করে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, ট্রাফিক জরিমানা বা মামলা সংক্রান্ত ভীতিকর বার্তা পাঠাত এবং সেই বার্তার সঙ্গে একটি ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংক যুক্ত করত।’
সানা শামীনুর রহমান বলেন, ‘সরকারি ওয়েবসাইটের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ হওয়ায় অনেক ভুক্তভোগী সেটিকে প্রকৃত বিআরটিএ ওয়েবসাইট মনে করে লিংকে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে জরিমানা পরিশোধ কিংবা মামলা সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে তারা তাদের ব্যাংক কার্ডের নম্বর, ব্যক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য দেন। প্রতারক চক্রটি বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীদের নিকট থেকে ওটিপি সংগ্রহ করে এবং সেই তথ্য ব্যবহার করে তাদের ব্যাংক হিসাব ও কার্ড থেকে অননুমোদিত লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করে। তদন্তে এ পর্যন্ত একই কৌশলে প্রতারক চক্রটি একাধিক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে সর্বমোট ৭ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে জানা যায়।’
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। মামলাটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং চক্রের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের লক্ষ্যে সিআইডির অভিযান চলমান রয়েছে। সিআইডি জনগণকে এ ধরনের ফিশিং প্রতারণা সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহবান জানাচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্রেরিত কোনো এসএমএস, লিংক বা অনলাইন পেমেন্ট সংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করার পূর্বে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও যোগাযোগ মাধ্যম থেকে তথ্য যাচাই করার জন্য অনুরোধ করা হচ্ছে। ম্যানুয়াল নোটিশ না পেলে মনে করবেন প্রতারণা। এসএমএস পেয়েই কাউকে টাকা দিবেন না।’