ঢাকা: অপারেশনের কথা বলে লাখ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজে সিনিয়র স্টাফ নার্স সাইফুল তালুকদারের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন তার নিজ এলাকা থেকে আসা ঢামেকে ভর্তি এক রোগী। রোগীর অভিযোগ এমআরআই থেকে শুরু করে অপারেশন ও ওষুধ বাবদ ওই নার্স তাদের থেকে আড়াই লাখের অধিক টাকা দাবি করেছেন।
জানা গেছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতীর কৃষক ইস্রাফিল হোসেনের স্ত্রী নাসিমা আক্তার (৩৮) মাথায় টিউমার শনাক্ত হওয়ার পর নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে সেখানে ভর্তি হতে না পেরে নিজ এলাকার বাসিন্দা ঢামেকের সিনিয়র স্টাফ নার্স সাইফুল তালুকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর গত ৮ সেপ্টেম্বর সাইফুল তাকে ঢামেক হাসপাতালের ২০০ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করিয়ে দেন। ভর্তির পর মাথার একটা এমআরআই করিয়ে দেন তিনি। যেখানে সরকারি খরচে এমআরই করতে সর্বোচ্চ ৬ হাজার টাকা লাগলেও সাইফুল নিয়েছে ১১ হাজার টাকা।
রোগী নাসিমা আক্তারের (৩৮) স্বামী কৃষক ইস্রাফিল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘নিজ এলাকার লোকই আমার সঙ্গে দালালি করল। অন্য লোকদের সঙ্গে কি না করে সে। এমআরই করতে ৬ হাজার টাকার জায়গায় আমার কাছ থেকে নিয়েছে ১১ হাজার টাকা।’
তিনি আরও বলেন, শুধু এমআরই নয়। সাইফুল অপারেশন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে আমাদের কাছে ২ লাখ টাকা দাবি করে। সে জানায়, চিকিৎসকদের ওই টাকা দিতে হবে। এছাড়া ওষুধের জন্য ৫০ হাজার টাকা জমা রাখতে বলেছে। এরপর আমরা হাসপাতালের অন্য রোগীদের কাছ থেকে জানতে পারি, অপারেশন করতে কোনো টাকা লাগে না। সাইফুল হাসপাতালের স্টাফ নার্স, এছাড়া আমাদের এলাকার ছেলে। তাকে বিশ্বাস করে এখানে এসেছিলাম। সে আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন ফোন দিলে আর ধরে না।
ইস্রাফিল বলেন, ‘আমরা গরীব মানুষ গ্রামে কৃষি কাজ করে খাই। লোক ছাড়াতো এখন চিকিৎসাই হয় না। সাইফুল ঢাকা মেডিকেলে চাকরি করে, সেই সুবাদে তাকে ধরে হাসপাতালে ভর্তি হই। কিন্তু সে চিকিৎসার নামে এভাবে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করবে, ভাবতেও পারি নাই। এখন ফোন দিলে আর ফোন ধরে না।’
হাসপাতালের ২০০ নম্বর ওয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র স্টাফ নার্স বলেন, ওই রোগী নিউরোসার্জারি ওয়ার্ডের পার্পেল ইউনিটে ভর্তি হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু উনার ভর্তি ফাইল রোগীর কাছে থাকতো না। জানতে পারলাম উনাদের পরিচিত এক সিনিয়র স্টাফ নার্স চিকিৎসা করিয়ে দিচ্ছেন। তবে রোগী অভিযোগ করল, অপারেশন বাবদ তার কাছে ২লাখ টাকা দাবি করেছে। এমনকি পার্পেল ওয়ার্ডে কোনো সুবিধা করতে না পারায় রোগীকে নিজেই ট্রান্সফার করে রেড ইউনিটে নিয়ে যায়। তবে বিষয়টি টের পেয়ে চিকিৎসকরা ট্রান্সফার বাতিল করে দেন এবং রোগীকে সর্বোচ্চ চিকিৎসার আশ্বাস দেন। এমনটা আমাদের কাম্য নয়। এটা আমাদের নার্স সমাজের কলঙ্ক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেলে যেকোনো রোগীকে পরিচিত বানিয়ে দ্রুত অপারেশন করিয়ে দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয় নার্সদের একটি একটি চক্র। তারা যেকোনো রোগীকে নিজের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে দ্রুত অপারেশন করিয়ে দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়। এমনকি তারা আইসিইউ সিন্ডিকেটের সঙ্গেও জড়িত আছে। কয়েক বছর আগে এমন অভিযোগের কারণে নার্স সাইফুল তালুকদারকে অন্য হাসপাতালে বদলি করে দেওয়া হয়। তিনি আবারও লোক ধরে ঢাকা মেডিকেলে চলে আসে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিনিয়র স্টাফ নার্স সাইফুল তালুকদার বলেন, ‘তিনি হাসপাতালের নতুন ভবনের নিচ তলায় মেডিসিন ট্রায়াজে ডিউটি করেন। রোগীটা তাদের গ্রামের। আমি নিজেই তাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে দেই। অনেক দিন যাবৎ রোগীটা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরছিল। গত ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করিয়ে দেই। এমনকি পার্পেল ইউনিটে অপারেশন করতে দেরি দেখে রেড ইউনিটে ডা. রাশেদ মাহমুদ এর আন্ডারে ট্রান্সফার করিয়ে নেই। কিন্তু রোগী যেতে রাজি হয় নাই। এমনকি আমার বিরুদ্ধে এমআরআই করে বেশি টাকা ও অপারেশন বাবদ ২ লাখ টাকা চেয়েছি এমন অভিযোগ দিচ্ছে। এসব মিথ্যা, রোগীর স্বজন কেন আমার বিরুদ্ধে এসব কথা বলছে আমি নিজেও জানি না। নিজের গ্রামের রোগীর উপকার করতে গিয়ে এখন নিজেই বিপদে পরে গেলাম।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সেবা তত্ত্বাবধায়ক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘এমন বিষয় আমার কানেও আসছে। তবে রোগীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’